শান্তিপুরের রাসে রাইরাজা কেন?

Share your experience
  • 30
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    30
    Shares

তিরুপতি চক্রবর্তীঃসারাভারতের বহুস্থানেই রাসপূর্ণিমা তিথিতে রাসযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। শান্তিপুর, নবদ্বীপ, কোচবিহার, বিষ্ণুপুর, দাঁইহাট,প্রভৃতি স্থানে মহাসমারোহে রাসোৎসব অনুষ্ঠিত হয় তবে যে রাস নিয়ে এতো মাতামাতি সেই রাসোৎসবের সূচনা ও প্রসারের কথা বলতে গেলেই আসে শান্তিপুরের কথা ।জনশ্রুতি অনুসারে রাসোৎসবের সূচনা করেছিলেন মহাপ্রভু ও শ্রীঅদ্বৈতাচার্য।

অদ্বৈত আচার্য ছিলেন শিবাবতার।  ভক্তদের মতে দ্বাপরে বৃন্দাবনে রাসলগ্নে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ যখন ষোড়শ গোপিনীকে নিয়ে রাসলীলায় মগ্ন তখন স্বয়ং মহাদেব ছদ্মবেশী গোপিনীর রূপ ধারণ করে রাসাঙ্গনে যান ফলে ভেঙে যায় রাস, কেননা রাসোৎসবে শ্রীকৃষ্ণ ব্যতীত অন্য কোন পুরুষের প্রবেশাধিকার ছিল না। মহাদেবের আর রাস দেখা হলো না। ধরা পড়ে মহাদেব সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি কলিতে সকল মর্ত্যবাসীকে রাসলীলা দেখবেন। জনশ্রুতি, কলিযুগে মহাদেব অদ্বৈতাচার্য রূপে জন্মগ্রহণ করে রাসোৎসবের সূচনা করেন আর এই উৎসবই ভাঙারাস কারণ শ্রীকৃষ্ণ রাসঙ্গন ছেড়ে চলে যাওয়ায় রাস ভেঙে গিয়েছিল। এক্ষেত্রে একটি বিষয়ের উল্লেখ না করলে নয়।

রাধিকারাজা :– ভাঙারাসের মূল যে বিষয় তার মধ্যে অন্যতম রাধিকারাজা বা রাইরাজা। এটি ভাঙারাসের মূল আকর্ষণও বটে। মহাদেবের কারণে বৃন্দাবনে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ রাসঙ্গন ছেড়ে চলে গেলে রাস ভেঙে যায় তখন গোপিনীরা সিদ্ধান্ত নেন যে রাধাকেই রাজা রূপে অভিষিক্ত করে রাসলীলা পরিচালিত হবে আর তার থেকেই রাইরাজার উৎপত্তি। মর্ত্যে রাসের সূচনা হলো। দ্বাপর যুগে স্বর্গীয় রাসোৎসবের সূচনা হয়েছিল বৃন্দাবনে। কিন্তু কলিযুগে মর্ত্যে কোথায় প্রথম রাস উৎসব শুরু হয়েছিল তা নিয়ে বিবাদ বেশ দীর্ঘ। তবে পুরাণ ও জনশ্রুতি অনুসারে মহাদেব যেহেতু দ্বাপরে রাস ভেঙেছিলেন তাই তিনি প্রথম কলিযুগে অদ্বৈতাচার্য অবতারে জন্মগ্রহণ করে মর্ত্যে রাসোৎসবের সূচনা করেছিলেন।

তবুও বির্তক এখানেই শেষ নয় কারণ অদ্বৈতাচার্য ঠিক কোন স্থানে রাসের সূচনা করেছিলেন তার বলা যায় না ।তবে অনেকেই মনে করেন যেহেতু তিনি শান্তিপুরনিবাসী ছিলেন ফলে ধরে নেওয়া যেতে পারে শান্তিপুরেই প্রথম মর্ত্যের রাস শুরু হয়েছিল। তবে এই বক্তব্যও সর্বসম্মত নয় ।এক্ষেত্রে আরও একটি প্রসঙ্গ  উল্লেখ্য। অদ্বৈতাচার্য প্রবর্তিত রাস ছিল টিমটিমে, নির্জন।তাহলে এই নির্জন রাস কীভাবে বিশ্বজনীন হলো? উওর খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে কাহিনীর আশ্রয়ে।

রাসের ইতিহাস অনুসারে, বারো ভূঁইয়ার এক ভূঁইয়া প্রতাপাদিত্য; পুরীর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের আমলে পূজিত দোলগোবিন্দের বিগ্রহ যশোরে নিয়ে যান। কিন্তু মানসিংহ বাংলা আক্রমণ করলে প্রতাপাদিত্য সেই বিগ্রহ বারো ভূঁইয়াদের গুরু অদ্বৈতাচার্যের পৌত্র মথুরেশ গোস্বামীর হাতে তুলে দেন। তিনি সেই বিগ্রহকে শান্তিপুরে নিয়ে এসে রাধারমণ জিউ নামে প্রতিষ্ঠা করলেন। একদিন হঠাৎই সেই বিগ্রহ চুরি হয়ে যায় এবং এর বেশকিছুদিন পর দিগননগরের এক বিল থেকে সেই বিগ্রহ উদ্বার করা হয়। ততদিনে মথুরেশ প্রয়াত হয়েছেন। তখন বড়ো গোস্বামী বাড়ির সদস্যদের মনে হয় শ্রীকৃষ্ণ একা আছেন বলে তাঁর কষ্ট হচ্ছে। আর তাই প্রতিষ্ঠিত হয় আটত্রিশ কেজি ওজনের একফুটের শ্রীমতীকে রাধারমণের পাশে স্থাপন করে যুগলে অভিষিক্ত হয়। সেই দিনটা ছিল রাসপূর্ণিমা। বলাবাহুল্য সেই দিনটা স্মরণীয় করে রাখতেই সেই দিন থেকেই থেকেই সাড়ম্বরে রাসোৎসব উদযাপন শুরু হয় বড়ো গোস্বামী বাড়িতে। তারপর থেকে প্রতিবছর রাস পূর্ণিমা তিথিতে বড়ো গোস্বামী বাড়িতে রাসোৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়  রাসের উৎসস্থল শান্তিপুর। তবে ততদিনে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর হাত ধরে বাংলায় রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তির আরাধনা শুরু হয়ে গিয়েছে। তবে যুগলমূর্তির আরাধনা কী শুধুই রাস পূর্ণিমাতে হয়? বিতর্কের কুলকিনারা আজও  হয়নি।

ভাঙারাস  আগেই বলেছি অদ্বৈতাচার্য প্রবর্তিত রাস হল ভাঙারাস ।এবার জানবো ভাঙারাস কীভাবে নগরপরিক্রমাতে পরিবর্তিত হয়। বড়ো গোস্বামী বাড়ি প্রবর্তিত এতো বড়ো উৎসব শুধুই চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকবে, তা আবার হয় নাকি? তাই গোটা শান্তিপুরের মানুষকে রাধারমণ-শ্রীমতীর যুগলমূর্তি দেখতে বর্ণাঢ্য এক শোভাযাত্রার আয়োজন করলেন বড়ো গোস্বামী বাড়ির অনুগামী খাঁচৌধুরীরা। রাস উৎসবের তৃতীয় দিনে এই বিখ্যাত ধনী পরিবারের অর্থানুকূল্যে যুগলমূর্তির শোভাযাত্রা প্রথম শান্তিপুরের পথে নেমেছিল। প্রদক্ষিণ করেছিল বিভিন্ন অঞ্চল সেই থেকেই শুরু ভাঙারাসের। একে একে সব বিগ্রহ বাড়ি ভাঙারাসের শোভাযাত্রায় যোগ দিতে শুরু করে। বৈষ্ণব রাসের উৎসস্থল এবং শাক্ত-বৈষ্ণবের মিলনক্ষেত্র হলো এই শান্তিপুর। তবে শাক্ত রাস ও বারোয়ারী রাসের প্রথম সূচনা হয়েছিল নবদ্বীপে।

বর্তমানে শান্তিপুরে ৩৭ টি বিগ্রহবাড়ি আছে তার মধ্যে ১৭ টি বিগ্রহবাড়ি ও ৭০ এর অধিক ক্লাবকে নিয়ে শান্তিপুরের ভাঙারাস অনুষ্ঠিত হয়। চারদিনের রাসোৎসবের শেষ উৎসব কুঞ্জভগ্ন। এইদিন নগর পরিক্রমাকারী বিগ্রহ যুগলকে হাজারো ভক্তের সমাবেশে ঢাক, ঢোল, কাঁশি, কীর্তন সহযোগে কোলে তুলে নাচানো হয় ও ভক্ত (মূলত ব্রাহ্মণ) দের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর কীর্তনের তালে নেচে বিগ্রহ নাটমন্দির থেকে অন্দরমহলে রওনা হন। তারপর চলে ভক্তবৃন্দের চামরদান ও পা ছুঁয়ে প্রণাম। এরপর মহা অভিষেক করে মূল বিগ্রহ ফিরে যায় মূল মন্দিরে। সারাবছর সেখান থেকেই দর্শন দেবেন। মানুষ ও অপেক্ষায় থাকে আরো একটা বছরের।

ছবি–লেখক

 


Share your experience
  • 30
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    30
    Shares

Facebook Comments

Post Author: tirupatikoulal

তিরুপতি চক্রবর্তী
তিরুপতি চক্রবর্তী।নদিয়ার শান্তিপুরের এই ক্ষেত্রগবেষক মূলত চিত্রগ্রাহক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।