শিল,শিলখোদাই : শিল কাটানোর গান

Share your experience
  • 81
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    81
    Shares

 

দীপঙ্কর পাড়ুই

 

“মহী গন্ধ শিলা                  দূর্বা পূস্পমালা
ধান‍্য ফল ঘৃত দধি।
স্বস্তিক সিন্দুর।                 কজ্জল কর্ণপুর
শঙ্খ দিল যথাবিধি।”

শিলা শব্দটি থেকে শিল কথাটি এসেছে। চন্ডীমঙ্গলের এই লাইনটিতে শিলার উল্লেখ রয়েছে।এখানে শিলা মানে চন্দন বাটার কথা বলা হয়েছে।শিল হল একধরনের চ‍্যাপ্টা পাথর,যার উপরে মশলা পেষণ করা হয়।এর আকার আয়তকার ও গোলাকারও হয়।আয়তকার চ‍্যাপটা পাথরের মাথার একদিকটি ত্রিকোনাকৃতি অথবা অর্ধচন্দ্রাকৃতির হয়ে থাকে।আসলে দুটি পাথরের খন্ড।একটি শিল একটি নোড়া।সংস্কৃত সাহিত‍্যে ‘শিলাপট্ট’ কথাটি রয়েছে,যার অর্থ পেষণশিল, শিল,ঘর্ষণশিলা, চন্দনপিড়ি।আর ‘শিলাপুত্র’ হল-নোড়া।বাঙালীর রন্ধনবিদ‍্যার জুড়িমেলা ভার।বাংলার রমনীর ঘরে রন্ধনের নানা তৈজসের সঙ্গে প্রতিদিনের ব‍্যবহৃত মশলার পেষণ যন্ত্র শিলও রয়েছে।বাঙালী দুটি ক্ষেত্রে শিল ব‍্যবহার হয়।যথা চন্দন ঘষতে ও মশলার পেষাই করতে।

পুজোপার্বণ,ব্রত,বিবাহে শিল বা শিলার ব‍্যবহার

ছোটবেলায় সরস্বতী পুজোর পরের দিন দেখতাম বাড়িতে গোটাসেদ্ধ হত।আগের দিন সব রান্না করে রেখা দেওয়া হত।ঐ দিন কিছু কিছু ঘরে শেতল ষষ্ঠী পুজো করা হত।শেতল ষষ্ঠী পুজোয় শিলকে পুজা করা হয়, কিছু কিছু ঘরে।হিন্দু বাঙালীদের বিবাহ অনুষ্ঠানে শিল বা শিলাপট্টকে কেন্দ্র করে একটি অনুষ্ঠান হয়।যার নাম-শিলারোহন।এ প্রসঙ্গে চিন্তাহরণ চক্রবর্তী উল্লেখ করছেন-‘শিলারোহণে বধূর পা শিলের উপর তুলিয়া দিয়া তাহাকে শিলার মতো স্থির হইবার  নির্দেশ দেওয়া হয়।শাস্ত্রীয় এই শিলারোহণ ছাড়া বিবাহের স্ত্রী-আচারের মধ‍্যে বাহাবিবাহ ও বধূবরণের সময় বধূকে শিল ও পাথরের থালার উপর দাঁড় করাইবার প্রথা আছে।অধিবাসেও শিলা বিভিন্ন অঙ্গে স্পর্শ করানো হয়।’বাংলাদেশে,বিশেষত চট্টগ্ৰামের লোকেরা বলে পাটা।বাংলার বাউরী(শিখর‍্যা ও ধুলিয়া) সম্প্রদায়ের মধ‍্যে ‘সরাভাঙা’অনুষ্ঠানে শিলা’র ব‍্যবহার আছে।

শিল খোদাই বা তক্ষণ

এখন ও পাড়া গাঁয়ে মাঝে মাঝেই শিল খোদাইকরদের দেখা যায়।তারা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় শিল কাটাও শিল কাটাও…. বলে ডাকতে থাকেন।কারা তক্ষণ করত এই শিলের উপর!৬৪ টি কলার ২১ নম্বরে রয়েছে তক্ষণ বা ছুতোরের বিদ‍্যা।বাঙলায় পাথর ছিল না অনেক  ঐতিহাসিক মনে করেন।কিন্তু চন্ডীমঙ্গলের এই লাইনটা অন‍্য কথা বলে-
‘ইন্দ্রনীল পাষাণে     রচিত কৈল পোতা’
বাংলায় পাকা মন্দির নিমার্ণে পাথরের ব‍্যবহার হত।এই পাথর যারা খোদাই করত তাদের বলা হত ‘করণ’।এদের বাংলায় বসবাস আজও আছে।ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায় উল্লেখ করছেন-করণ কথার মূল অর্থ,খোদাই যন্ত্র,কাটিবার যন্ত্র;এই অর্থে ‘করণি’ কথাটি আছও ব‍্যবহৃত হয়।ইতিহাসের গোড়ার দিকে লেখার কাজটা নরুণ জাতীয় কোনও যন্ত্রদ্বারা বোধ হয় নিস্পন্ন হইত।’ফারাক্কার তীরে বসবাস কারী ছুতোর সম্প্রদায়ের মানুষরা আজও শিল খোদাই করে চলেছেন।পশ্চিম মেদনীপুরের কায়স্থদের একটি সম্প্রদায়ও শিল খোদাই করেন।

শিলা বা শিল খোদাই’র মোটিফ বা নকশা

 

শিলে খোদাই করার কারন মশলা খুব ভালো ভাবে পেষণ করা যায়।নরুন বা ছেনির ও হাতুরির সাহায‍্যে শিলের উপরিতলে খুঁদে ছোট্ট ছোট্ট এক ধরনের রেখা মতো করা হয়,তাকে শিলাচিত্রনও বলা যায়।এই খোদাই করার সময় চ‍্যাপ্টা শিলে মূলত দুটি জায়গায় ভাগে ঘটে থাকে।কোথাও কোথাও তিনটি ভাগও দেখা যায়।একদম উপরিভাগে,মানে ত্রিকানাকৃতি বা অর্ধচন্দ্রাকৃতি জায়গাটি তে পদ্ম,অষ্টদল পদ্ম,মাছ,এক জোড়া ধানের শীষ,এক জোড়া পানপাতা ইত‍্যাদি মোটিফের ব‍্যবহার দেখা যায়।নীচের জায়গা গুলিতে আজিকাটা রেখা,উপরনীচ,সোজাসুজি রেখা,বর্গাকার খোপ তৈরি করা হয়। এ সমস্ত মোটিফ গুলির সঙ্গে আলপনার অদ্ভুত মিল দেখা যায়।অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাংলার ব্রতে উল্লেখিত আলপনার মোটিফ গুলিতে পদ্ম,পানপাতা, নকশা,পিড়েচিত্রের বর্হিবন্ধনীর নকশার সাথে সাদৃশ‍্য রয়েছে।যে শিল্পীরা শিলে খোদাই করছেন তাদের অবচেতনে ঐ সমস্ত মোটিফ বা নকশাগুলি রয়ে গেছে।এ সমস্ত নকশা শিলে কেন!কারন এই মোটিফ গুলি প্রজননের প্রতীক,উর্বরতার প্রতীক।খাদ‍্য শস‍্য জনিত মোটিফ গুলি আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।এ সব মোটিফ খাদ‍্য শস‍্য থেকে ও আলপনা উঠে এসেছে বলে মনে হয়।

শিল কাটানোর গান

‘শিল কাটাও কাটাও শিল কাটাও
দিদি শিল কাটায়ে লাও।
মশলা পিষাও দিদি মশলা পিষাও
মাছ কাটাও,ফুল কাটাও।
ছেনি সে খট্ খট্
পাতত্থর রাখো ছটফট।
ও দিদি মশলা ভালো পিষাও
শিল কাটাও কাটাও শিল কাটাও…’

২০১৬ সালে হুগলীর ত্রিবেনী অঞ্চল থেকে এই শিল কোটানোর গানটি গান সংগৃহীত।খোদাই শিল্পী উত্তম সাহু র কাছ থেকে।উত্তম সাহু এসেছেন বিহার থেকে থাকেন নৈহাটীতে ।বর্তমানে যারা শিল খোদাই করেন মূলত হিন্দী ভাষী, বিহারী,মাহাতো সম্প্রদায়ের লোক।এদের গানে হিন্দী শব্দের ব‍্যবহার রয়েছে।যার ফলশ্রুতি এই গানটি। বাংলায় বহুদিন থাকতে থাকতে বাংলাও তারা শিখে ফেলেছেন।অবশ‍্য মেদনীপুরের খোদাইকার’রা বাংলা ভাষাতেই গান করেন,তবে তাদের গানের উচ্চারণে উড়িষ‍্যার ভাষার টান আছে।বর্তমানে ফারাক্কা ব‍্যারেজের কাছে ছুতোরদের সম্প্রদায় এই শিল খোদাই’র কাজ করে চলেছেন।

বাংলায় শিল শুধু পেষণকারী যন্ত্র নয়।এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে শিল কাটানোর গান,খোদাই’র নানা আঙ্গিক,মোটিফ বা নকশা ইত‍্যাদি বিষয়গুলি।বাংলা তথা সারা ভারতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শিল বা শিলা যাপনের নানা সংস্কৃতি ও ঐতিহ‍্য।বাংলার মঙ্গলকাব‍্য গুলিতে শিল,শিলের ব‍্যবহার,বিবাহে শিল সম্পর্কিত নানা বর্ণনা পাওয়া যায়।বর্তমানে শিলখোদাই পেশাটি লুপ্ত হতে চলেছে।এখন বাড়িতে বাড়িতে মিক্সচার মেশিন চলে এসেছে।মানুষের হাতে সময় কম।কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত‍্যি যে শিলে বাটা মশলার যা স্বাদ।মিক্সচার মেশিনে তা পাওয়া যাচ্ছে না।হয়তো চটজলদি মেশিনে মশলা গুড়ো হচ্ছে বটে।কিন্তু সেই স্বাদ কই।যে স্বাদের উপর ভর করে একসময় কবি কঙ্কন লিখেছিলেন-
“বেগুন কুমড়া কচা          তথি দিয়া কলা মোচা
বেশার পীঠালি ঘন কাঠি।।
ঘৃত সন্তলন তথি             হিঙ্গ জিরা দিয়া মেথি
সুক্তার রন্ধন পরিপাটী।।

আরও পড়ুন-বাংলার কুলাচিত্র বাংলার বুননশিল্প : চাদোঁয়া

তথ‍্যঋণ : 
১.রায়,নীহাররঞ্জন-বাঙালীর ইতিহাস,দেজ,মাঘ ১৪১৪
২.চন্ডীমঙ্গল-কবি কঙ্কণ মুকুন্দ বিরচিত,সুকুমার সেন সম্পাদিত,সাহিত‍্য অকাদেমি,নতুন দিল্লি,২০১৭
৩.চক্রবর্তী,চিন্তাহরণ-হিন্দুদের আচার-অনুষ্ঠান,প‍্যাপিরাস,২০০১
৪.মুখোপাধ‍্যায়,অণিমা-সতেরো শতকের রাঢ়-বাংলার সমাজ ও সাহিত‍্য,অণিমা প্রকাশনী,ডিসেম্বর,১৯৯০
৫.অবনীন্দ্র রচনাবলী,নবম খন্ড,প্রকাশ ভবন,মাঘ ১৪১৭
৬.শিল কানানোর গানটি লেখক কতৃক সংগৃহীত।

 

বিশেষ কৃতজ্ঞতা

১.শিল্পকলার অধ‍্যাপক বিনায়ক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়ের কাছে।তিনি নকশা করা শিলের ছবি গুলি দিয়েছেন।
২.শিল খোদাই শিল্পী উত্তম সাহু

 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 81
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    81
    Shares

Facebook Comments

Post Author: দীপঙ্কর পাড়ুই

দীপঙ্কর পাড়ুই
দীপঙ্কর পাড়ুই--বর্ধমান বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতক।কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর।লোকশিল্প নিয়ে গ্ৰাম ঘোরাঘুরিও লিখতে ভালোবাসি।আচমন,রাঢ়কথা ইত‍্যাদি পত্রিকায় ও বঙ্গদর্শন ও দুনিয়াদারি পোর্টালে কতগুলি লোকশিল্পের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।