শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো

Share your experience
  • 14
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    14
    Shares

রিয়া দাস

শোভাবাজার রাজবাড়িতে কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে হয় পূজার বোধন।সেইদিন থেকে ষষ্ঠী অবধি এই বাড়িতে চন্ডীপাঠের ধ্বনি উচ্চারিত হয়। এটি হলো উত্তর কলকাতার অন্যতম এক বনেদি বাড়ির পুজো। নবকৃষ্ণ দেব ১৭৫৭ সালে এই পুজোর সূচনা করেন।ঠাকুরদালানে  উপচে পড়া আমোদের আয়োজন হতো, সেই বাড়ি পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে প্রাসাদনগরীর ‘ রাজবাড়ী ‘। আমোদিনী পুজোকে বলা হতো ‘ কোম্পানির পুজো ‘। কারণ ফিরিঙ্গিরা ছিল সেই বনেদি দূর্গোৎসবের অন্যতম মূল অংশ।

রাজা নবকৃষ্ণ দেব তার ভ্রাতুষ্পুত্র গোপীমোহন দেবকে পুত্র হিসেবে দত্তক নেন। পরে নিজের ছেলেকে নিয়ে আদি বাড়ি দক্ষিণ দিকে আরো একটি ভবন তৈরি করে বসবাস শুরু করেন। নবকৃষ্ণ দেব এর মৃত্যুর পর শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো বড় ও  ছোট তরফ, এই দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। তবে সেই প্রথম থেকে যে নিয়ম, আচার-অনুষ্ঠান রাজবাড়ীতে শুরু হয়েছিল আজও তা অব্যাহত। ১৭৫৭সালে পলাশীর যুদ্ধে হেরে গিয়েছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা।সেই যুদ্ধে ব্রিটিশদের হয়ে  যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব। জয়ের আনন্দেই সেবছর নিজের বাড়িতে দুর্গাপূজা করেন তিনি। সে বছর পুজোর অন্যতম অতিথি ছিলেন লর্ড ক্লাইভ। এখনো সেই পরম্পরা মেনেই পুজোর আয়োজন করা হয় এখানে।

এই বাড়ীর সপ্তম প্রজন্মের অলোক কৃষ্ণদেবের ঝুলিতে রয়েছে অনেক জমানো গল্প। শোনা যায় শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস একবার এখানে পূজা করেছিলেন।পুজোর জন্য শ্রীরামকৃষ্ণ এই বাড়িতে এসেছেন শুনে আশপাশ থেকে এত লোক আসতে শুরু করে যে ঘরে টেকা মুশকিল হয়ে পড়ে। শুধুমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণই নয়, এই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ থেকে বিবেকানন্দ, এমনকি বিদ্যাসাগর, গান্ধীজীর মত মানুষদেরও যাতায়াত ছিল।

শুধুমাত্র ঐতিহ্য আর ইতিহাসের জন্যই যে এই পুজো অনন্য তা নয়। শোভাবাজার রাজবাড়ির মাতৃমূর্তির বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এছাড়া, এখানকার পূজোর উপাচারও বেশ চমকপ্রদ। সন্ধি পুজোতে কামানের গোলার শব্দে শুরু হতো পূজো এবং শেষও হতো সশব্দেই। তবে এখন সে সব শুধুই স্মৃতি,বর্তমানে কেবল অষ্টমী আর নবমীতে ফাঁকা বন্দুকের শব্দ করা হয়।

সে সময় সারাদেশ থেকে আসতেন বত্রিশজন শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ। কৃষ্ণ নবমী তিথি থেকে তাঁরা শুরু করতেন চণ্ডীপাঠ, সেই পাঠ শেষ করতে হতো ষষ্ঠীর দিন। এখনো হয় ২১০ বার চণ্ডীপাঠ।  ব্রাহ্মণরা এসে বেদ এবং রামায়ণপাঠ করেন।একবার পুজোর বলির জন্য উৎসর্গ করা পশু আশ্রয় নেয় পরিবারের তৎকালীন কর্তা হিন্দুকুল চূড়ামণি রাধাকান্ত দেব এর পায়ের তলায়। সে বছর থেকে পশুবলি বন্ধ হয়ে যায় শোভাবাজার রাজবাড়িতে। মা দুর্গা এই বাড়িতে বৈষ্ণবী হিসেবে পূজিতা হন। তাই শোভাবাজার রাজবাড়ি পুজোয় অন্নভোগ থাকেনা। গোটা ফল, গোটা আনাজ, শুকনো চাল, কচুরি, খাজা, গজা, মতিচুর সহ নানা ধরনের মিষ্টি দেবীকে উৎসর্গ করা  হয়। দেবীকে বসানোর জন্য বিরাট এক সোনার সিংহাসন তৈরি করা হয়েছিল। এই সিংহাসন কে ঘিরে ছিল সোনার রুপার কারুকাজ। ঠাকুর দালানের সামনে আবার অতিথি আপ্যায়নের জন্য বাইজি নাচের আসর বসত। আর এরপর চলতো ইংরেজদের প্রিয় বল ড্যান্স।

উল্টো রথের দিন কাঠামো পুজো হয়। তারপর থেকে বাড়িতে প্রতিমা নির্মাণ শুরু। উত্তর কলকাতার এই রাজবাড়ীতে কৃষ্ণা নবমী তিথিতে বোধন হয়। ঠাকুর দালানের বেদি করে দেবীর ঘট স্থাপন করা হয়। ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় বেল গাছের তলায় বরণ, আমন্ত্রণ, অধিবাস হয়। তারপর প্রতিমার সামনে ঘর স্থাপন ও প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেবী দুর্গাকে সোনার নথ ও সিঁদুর পড়ানো হয় ওইদিন।সপ্তমীতে  রাজবাড়ির নিজস্ব ঘাটে নবপত্রিকা স্নান ও মহাস্নানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দেবীর আরাধনা শোভাবাজার রাজবাড়ির রীতি অনুযায়ী দশমীর দিন সকালেই বিজয়া হয়। বিষাদের সুর বেজে ওঠে সানাইয়ে। দশমীর দিন প্রতিমা নিয়ে বেরোনোর সময় একটি নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানো হতো। ইদানিং সরকারি আদেশে সেই পাখি ওড়ানো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবুও রীতি অনুযায়ী মাটির তৈরি নীলকন্ঠ পাখি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।তবে এবার মানুষের গায়ে নীলকন্ঠ পাখি এঁকে ওড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন দেব পরিবারের সদস্যরা। বিশ্বাস ছিল, এই নীলকন্ঠ পাখি কৈলাসে মহাদেবকে মায়ের রওনা হওয়ার খবর দেয়। সেই বিশ্বাসকে পাথেয় করেই আজও বর্তমান সমস্ত সাবেকিয়ানা।

শোভাবাজার  রাজবাড়ীতে বিকেলে শোভাযাত্রা করে গঙ্গায় প্রতিমা নিরঞ্জন। এই রাজবাড়ী প্রতিমা নিরঞ্জনের দৃশ্যটি অভূতপূর্ব। দুটি নৌকার মাঝে প্রতিমা রাখা হয়। মাছ নদীতে পৌঁছে নৌকা দুটি ধীরে ধীরে সরে গেলে মাতৃমূর্তি ভেসে যায় বিজয়ায়। এরপর…….. ঠাকুরদালানে জমে থাকে শুকনো বেলপাতা। যার থেকে বেশ কিছু পাতা ঠাঁই পায় রাজবাড়ীর গৃহিণীদের আঁচলে।বেল পাতায় আলতা দিয়ে দুর্গা নাম লিখে নিজেদের কাছে রাখেন তাঁরা। সিঁদুর খেলায় বদলে দশমীতে এটাই রেওয়াজ এইবাড়ির।

ছবি–লেখক

তথ্যসূত্র১/দেবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায়, বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০০২, পাতা-১০১-১০৩, আনন্দ প্রকাশক।

২/কলকাতা পৌরসংস্থার ১৯৮০ অনুচ্ছেদ ২ এর ৪২ ক ধারার বিধান অনুযায়ী স্থাপত্যরীতি সংক্রান্ত ও ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ইমারত।

৩/Sengupta,Subodh Chandra and Bose,Anjali,sansad Bangali charitabhidhan,1998, edition,p,242.

৪/পাতাঃ কলকাতা সেকালের ও একালের.djvu/974।উইকিসংকলন।

৫/Heritage buildings in Kolkata।west Bengal tourism.

৬/Ratnottama Sengupta.”old is gold,even in pujas”Times of India,21 October 2007.


Share your experience
  • 14
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    14
    Shares

Facebook Comments

Post Author: রিয়া দাস

রিয়া দাস
রিয়া দাস।ইতিহাসে স্নাতকোত্তরে পাঠরত।ক্ষেত্রসমীক্ষক।