শ্রীধাম শান্তিপুরের ভাঙারাস

Share your experience
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    20
    Shares

রাহুল হালদারঃরাস কি? উত্তরের সন্ধানে তৈত্তিরীয় উপনিষদ বলে “রসো বৈ সঃ–রসং হেবায়ং লব্ধা আনন্দী ভবতি”।এর ভাষ্যে শ্রীশঙ্করাচার্য লিখেছিলেন —‘আনন্দ কারণং রসবৎ ব্রহ্ম  * * ব্রহ্মৈব রসঃ রসত্ব প্রসিদ্ধি ব্রর্হ্মণঃ অর্থাৎ আনন্দঘন ভগবান্ রসস্বরূপ’।এরপরেই অনেকেরই মনে প্রশ্ন উঁকি দেয় রস থেকেই কি রাস? তখন রসের যে সংজ্ঞা আমরা পাই -সেখানে দেখি–

রসঃ সারোহমৃতং ব্রহ্ম আনন্দো হ্লাদ উচ্যতে।

নিঃসারং তেন সারেণ সারবৎ লক্ষ্যতে জগৎ।।

সুরেশ্বরের মতে ‘রস’ শব্দের অর্থে আমরা পাই সার,অমৃত,ব্রহ্ম, আনন্দ, হ্লাদ কিন্তু ‘রসো বৈ সঃ’ জায়গায় রস শব্দে সার বা নির্যাসই বোঝায় যাকে শঙ্করানন্দ অনুমোদন করেন না।তিনি বলেন ‘রসঃ আনন্দদ্রবঃ স্বয়ং প্রকাশমানানন্দ ইত্যর্থঃ’।সংস্কৃত আলঙ্কারিকেরা এটাকে অনুমোদন করে বলেন যে চিত্তের সত্ত্বোদ্রেকে রজঃ ও তমঃ তিরস্কৃত হইলে এক যে অপূর্ব, লোকোত্তর, চমৎকার,অখণ্ড আনন্দচিন্ময় ভাব উদিত হয় -যেটা ‘ব্রহ্মাস্বাদ-সহোদর’ যা সহৃদয় বোদ্ধার অনুভববেদ্য সেটাই ‘রস’।

রাসের সংজ্ঞায় সনাতন গোস্বামী বলেছেন “প্রেমরস-পরিপাক-বিলাস-বিশেষাত্নকঃ ক্রীয়াবিশেষঃ “অথবা ‘পরমরসকদম্বমরো ব্যাপার-বিশেষঃ’।ভাগবতের টীকাকার বিজয়ধ্বজ রাস শব্দের বুৎপত্তি  করে লিখেছেন ” নৃত্যাদিযু ভরতরীতিসংজ্ঞেযু গাতুমুপক্রান্তেযু যোহধিরসোল্লাসো/জায়তে স রসঃ তৎসন্বন্ধী রসো রাসঃ তদ্রুদেকেণ ক্রীয়া নৃত্যবিশেষঃ।এরপর বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেছেন, —“নৃত্যগীত চুম্বনালিঙ্গনাদীনাং রসানাং সমূহো রাস স্তন্ময়ী যা ক্রীড়া সা রাসক্রীড়া”। অর্থাৎ রাস হল সেই ক্রীয়া যাতে রস পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত, যেখানে মাধুর্যের চরম (acme)।সহজ করে বলা হয় অখিল রসামৃত-মৃর্ত্তি,রসরাজ, রসিক-শেখর শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে ‘রস-ব্রহ্ম’  আস্বাদনের জন্য ব্রজগোপী বিশেষতঃ রাসেশ্বরী শ্রীরাধার সঙ্গে যে চিতানন্দময়ী ক্রীয়া করেছিলেন সেই ক্রীয়াই রাস।

বৈষ্ণব মতে শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের শ্রেষ্ঠ লীলাপর্যায় হলো রাসলীলা। আর নদিয়ার বুকে শ্রীচৈতন্যদেবকে কৃষ্ণনামে সেবা করে  শান্তিপুরের অদ্বৈতাচার্যের বংশধরেরা তাঁদের পূজিত কুলদেবতাকে এই রসের আকার দিয়ে রাসলীলাকে চরমোৎকর্ষ দান করেছিলেন।সেই সময় থেকে আজও পর্যন্ত   শান্তিপুরের রাসে সেই  রসের ধারা আজও বহমান।তাই তো কার্তিক মাস পড়তেই শান্তিপুরের সকল স্থানে হরি নাম সংকীর্তনে মুখরিত হয়ে ওঠে।মহাত্মা বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী বলতেন শান্তিপুরের রাসযাত্রা, ঢাকার জন্মাষ্টমী ও বৃন্দাবনের ঝুলন দেখবার মতন জিনিস। সৎগুরুর  কথাটা আমরা প্রতি পদে চাক্ষুস করি কার্তিক পূর্ণিমা তিথিতে শান্তিপুরের মাটিতে।

দুই

শান্তিপুরের রাস তিন দিনের।প্রথম দুই দিন গোস্বামীরা তাঁদের আরাধ্য শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তিকে নিজেদের গৃহ অঙ্গনের রাসমঞ্চে সুসজ্জিত করে খোল করতাল সহযোগে কৃষ্ণ  নামসংকীর্তনে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে।তারপর তৃতীয় দিন সেই আরাধ্য মূর্তি মোমবাতির আলোর রোসনায় সুসজ্জিত হাওদার বেহারারা কাঁধে তুলে নিয়ে বিভিন্ন রকমের সঙ্,ময়ূরপঙ্খী, রামায়ণ,মহাভারত,পুরাণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নগর পরিভ্রমণে বের হয়।তৃতীয়দিনের এই নগর পরিক্রমণার মধ্যে দিয়ে রাসযাত্রা ভেঙে যায়,সেই ভেঙে যাওয়া(সমাপ্তি ) রাসই হলো শান্তিপুরের বিখ্যাত ভাঙ্গারাস।

শান্তিপুরের স্থানীয় একটি খেউরে জানা যায়—

দাদা,লাগল মজা বাদাম ভাজা/মদ খেয়ে চোখ রাঙা

নবদ্বীপে ‘ভরারাস’,শান্তিপুরের ‘ভাঙ্গা’।

রবীন্দ্র জীবনীকার তথা সাহিত্য সমালোচক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় শান্তিপুরের রাসের বর্ণনায় লিখেছিলেন “শান্তিপুরের রাস,ভাঙারাস এদিকের লোকের প্রধান আকর্ষণ। আমি তো একবার যাই ছোটবেলায়।বাবার এক মক্কেল কেষ্ট গোঁসাই ছিলেন গোঁসাই বংশের।তাঁরই নিমন্ত্রণে সকলেই যাই।…. গোঁসাই এর বাড়ির দোতালায় বসে রাসযাত্রার মিছিল দেখি।সেটা বোধ হয় রাস উৎসবের শেষ দিন।গোঁসাইদের নিজ নিজ ঘরের বিগ্রহগুলিকে চর্তুদোলায় তুলে শোভাযাত্রা চলেছে – সংকীর্ণ গ্রাম্যপথ জনাকীর্ণ, ভাঙারাস দেখবার জন্য বাংলাদেশের নানা স্থান থেকে এমনকি মণিপুর থেকেও বৈষ্ণবরা আসতো সেকালে”।

শান্তিপুরের ভাঙ্গারাসে শোভাযাত্রার উৎস সন্ধানে গেলে দেখা যায়, বড়গোস্বামী বাড়ির  মথুরেশ গোস্বামীর মৃত্যুর কিছুদিন পরে একদিন হঠাৎ করে তাঁদের কুলবিগ্রহ রাধারমণকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।এই আকস্মিক ঘটনায় বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে যায়।তখন সেই বাড়ির মহিলারা পণ করেন, গোপিনীরা যেমন শ্রীকৃষ্ণকে খুঁজে পাওয়ার জন্য কাত্যায়নী ব্রত করেছিলেন তারাও রাধারমণকে খুঁজে পাওয়ার জন্য কাত্যায়নী ব্রত করবেন।এই পণ করার কিছুদিন পর স্বপ্নাদেশে জানা যায় দিগনগরের কাছে এক দীঘির কাছে রামাধমণ রয়েছেন।সেই স্থান থেকে মূর্তিকে বাড়ি নিয়ে আসার পর বাড়ির লোকেদের মনে হয়, রাধারমণের একা থাকতে মন লাগছে না।তাই বাড়ির লোকেরা তাঁর পাশে রাধিকার মূর্তি স্থাপন করেন।এই উদ্যোগে এগিয়ে আসেন শ্রীঅদ্বৈতচার্যের অনুচর খাঁ চৌধুরী বংশের রামগোপাল,রামজীবন,রামশরণ ও রামচন্দ্র খাঁ।মূলত তাঁদেরই উৎসাহে রাধারমণের সঙ্গে রাধিকার(শ্রীমতী)  বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হলে,নব্য যুগলমূর্তিকে শান্তিপুরবাসীর সঙ্গে পরিচয় করাবার জন্য কার্তিক পূর্ণিমার তৃতীয় দিনে নগর পরিক্রমার ব্যবস্থা করা হয়।বিবাহ বাসর ভেঙে যাওয়া থেকেই বোধহয় ‘ভাঙ্গা” শব্দটা রাসপূর্ণিমায় অনুষ্ঠানের সঙ্গে জুড়ে সেটা ভাঙ্গারাস নামে খ্যাত হয়েছে।

আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে খাঁ বাড়ির উদ্যোগে যুগলমূর্তিকে নিয়ে যে নগর পরিক্রমার অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল,তখন থেকে আজ পর্যন্ত বড় গোস্বামী বাড়ির সঙ্গে অনান্য গোস্বামী বাড়ি এবং শাক্ত আরাধনায় ন্যস্ত বারোয়ারী পূজো কমিটিগুলিও আরো উৎকর্ষ ও আধুনিকতার সঙ্গে গোস্বামী বাড়ির বৈষ্ণবীয় ঐতিহ্যকে ধরে রেখে সেই ভাঙ্গারাসের শোভাযাত্রা চলে আসছে।

কবি নবীনচন্দ্র সেন শান্তিপুর বর্ণনায় লিখেছিলেন—–

“নদে শান্তিপুর হতে খেঁড়ু আনাইব

নূতন নূতন ঠাটে খেঁড়ু শুনাইব।

কার্তিকে এদেশে হয় কালীর প্রতিমা

দেখিবে আদ্যার মূর্তি অনন্ত মহিমা

ক্রমে ক্রমে হইবেক হিমের প্রকাশ

সে দেশে কি রস আছে এ দেশের রাস”।

শান্তিপুরের রাস দেখে তাঁর উপলব্ধি”শান্তিপুরে হইয়া থাকে ‘কালার রাস ‘ আর শ্রীচৈতন্যে দেবের জন্ম ও লীলাভূমি নবদ্বীপে হইয়া থাকে ‘কালীর রাস’।শান্তিপুরের ‘কালার রাস’দেখে, সেই রাসযাত্রা সম্পর্কে আরো লিখেছেন–“শান্তিপুরের রাস দেখিয়াছি।উহা বঙ্গদেশে বিখ্যাত।শুনিয়াছি পূর্ব্বে শান্তিপুরের সীমান্তিগণের অন্তঃপুর কপাট ও হৃদয় কপাট উভয়ই রাসের সময় খুলিয়া যাইত,তাহারা পালে পালে রাস দর্শনোপলক্ষে নগর ভ্রমণে বর্হিগত হইয়া রাস পৌর্ণমাসীর শিশিরস্মান কৌমুদীকে তাঁহাদের উচ্ছুরিত রূপ জ্যোৎস্নায় ও হাসির ঝলকে সম্মুজ্জল করিতেন এবং ‘রসে’র ছড়াছড়ি হইত।…….এদেশে রাস এখনও আছে।সচারচর রাসের অর্থ কৃষ্ণ একক,কিম্বা তাঁহার প্রেমবিহ্বলা রাধাসহ কেন্দ্রস্থলে দণ্ডায়মান,আর জোড়া জোড়া গোপ গোপীগণ হাতাহাতি করিয়া তাঁহাদের বেড়িয়া এক কাষ্ঠ চক্রে ঘুরিতেছেন।কল্পনার চষমায় দেখিলে বলিতে হয় নাচিতেছে।……শান্তিপুরে এরূপ রাস কেবল এক বাড়িতে হইয়া থাকে,তাহাকে তাই ‘চাকফেরা’ গোস্বামী বাড়ি বলে।অনান্য স্থানে স্থাপিত রাধাকৃষ্ণের মূর্তি সজ্জিত খাটে স্থায়ী দেবালয়ে বহু সমারোহে পূজিত হইয়া থাকেন এবং তৃতীয় দিবসে নানাবিধ পৌরাণিক ও নৌতনিক পুতুলের শ্রেণীসহ নগর ভ্রমণে বর্হিগত হইয়া থাকেন।এই উপলক্ষে সমস্ত নগরটি আনন্দে মাতিয়া উঠে।…তৃতীয় দিবস ঐ নগর পরিভ্রমণ বা ভাঙ্গারাস দেখিতে বহুদূর হইতে লক্ষ দর্শকের সমাগম হয়”।সেই সময় থেকে আজকের দিনেও লক্ষাধিক দর্শকের  কৃষ্ণনাম মহামন্ত্রে শান্তিপুরের রাস মুখরিত হয়ে ওঠে।

ছবি–লেখক


Share your experience
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    20
    Shares

Facebook Comments

Post Author: রাহুল হালদার

রাহুল হালদার
রাহুল হালদার।শিক্ষক,শান্তিপুর হরিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ।