শ্রীখণ্ডের নরহরি সরকার ও বড়ডাঙার মেলা

Share your experience
  • 48
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    48
    Shares

স্বপনকুমার ঠাকুরঃশ্রীখণ্ডের বৈদ্যবংশের অন্যতম  কৃতিপুরুষ ছিলেন  বৈষ্ণব ধর্মানুরাগী পন্থদাস।দীনেশচন্দ সেন বৃহৎবঙ্গে লিখেছেন– এই পন্থদাস ছিলেন  সেনবংশের রাজা বল্লাল সেনের অন্যতম প্রধান সেনাপতি।আদিনিবাস সপ্তগ্রামের নিকটবর্তী বালিনছিগ্রাম। ( পৃ–৭১১)পরবর্তীকালে শ্রীখণ্ডে বসতি করেন।এই বংশের প্রখ্যাত চৈতন্যপরিকর নরহরি সরকারের বাবা নারায়ণ দাস। অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায়ের মতে ইনি ছিলেন রুকনুদ্দিন বারবাক শাহের গৃহচিকিৎসক।নরহরি প্রথম জীবনে বড়মাপের রাজকর্মচারী ছিলেন। এইকারণে গৌড়েশ্বর  তাঁকে সরকার  উপাধিতে ভূষিত করেন।অষ্টধাতুর কৃষ্ণবিগ্রহ গোপীনাথ ছিল নরহরিদের কুলদেবতা।

কাটোয়া অঞ্চলে  প্রাকচৈতন্যযুগে সর্বপ্রথম  গোপীনাথের পূজার্চনা নারায়ণ দাস শুরু করেন।গোপীনাথ মূর্তিটি অনেকদিন আগেই চুরি হয়ে গেছে।বর্তমানে প্রস্তরনির্মিত গোপীনাথ নিত্য সেবিত হন  ঠাকুরবাড়ির মন্দিরে।নারায়ণের  তিন সন্তানের মধ্যে জেষ্ঠ্য মুকুন্দ ছিলেন গৌড়েশ্বর হোশেনশাহর  রাজবৈদ্য।ইনিও ছিলেন গোপীভাবের সাধক।অসুস্থ হোসেনশাহকে একবার চিকিৎসা করতে গিয়ে ময়ূরপুচ্ছ বিশিষ্ট পাখা দেখে তিনি কৃষ্ণপ্রেমে মূর্ছিত হয়ে পড়েছিলেন।চৈতন্যচরিতামৃত , শ্রীনিবাস আচার্যর লেখা নরহরিঠক্কুরাষ্টক,  লোচনদাসের চৈতন্যমঙ্গলকাব্যে এর বিবরণ রয়েছে–

ময়ূরের পাখা দেখি রাজসন্নিধানে।

পড়িলেন কৃষ্ণরূপ আকর্ষিয়া মনে।।( চৈতন্যমঙ্গল সূত্রখণ্ড)।।

শ্রীখণ্ডের দক্ষিণে বড়ডাঙা নামে নিভৃত এক অরণ্য ছিল।সেখানেই তিনি রচনা করেছিলেন  কৃষ্ণসাধনার বিলাসকুঞ্জ। অনন্তসংহিতায় উল্লেখ আছে-“বৃন্দাদেবী প্রাণসখী শ্রীমুকুন্দ কলৌযুগে।” এইকারণে বড়ডাঙাকে দ্বিতীয় বা গুপ্তবৃন্দাবন বলা হয়।  এই বড়ডাঙার প্রান্তরে  প্রখ্যাত বৈষ্ণবসাধক অভিরাম গোস্বামীর সঙ্গে  মুকুন্দতনয় রঘুনন্দনের মিলন হয়েছিল।উভয়ে প্রেমাবেশে নৃত্য করেছিলেন।রঘুনন্দনের পায়ের নুপূর ছিটকে গিয়ে পড়েছিল আকাইহাটের কালাকৃষ্ণদাসের পাটবাড়িতে।স্থানটি এখনো নুপূরখণ্ড নামে সুপরিচিত।

মুকুন্দের কণিষ্ঠ ভ্রাতা নরহরি  মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ পার্ষদ।তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত গোপীভাবের কৃষ্ণসাধনাকে পরিণত করেন গৌরনাগরী বা গৌরপারম্যবাদে।আকুমার ব্রহ্মচারী নরহরির দৃষ্টিতে শ্রীগৌরাঙ্গ ছিলেন স্বয়ং গোপীনাথ।নিজেকে ব্রজের কৃষ্ণসখি  মধুমতী বলেই ভাবতেন।রচনা করেছিলেন চণ্ডীদাসের ভাবে ভাষায় গৌরনাগরী পদাবলী।

শয়নে গৌর স্বপনে গৌর, গৌর নয়ন তারা।

জীবনে গৌর মরণে গৌর, গৌর গলার হার।।

নরহরির এই গৌরনাগরী ভাবকে আরও সমৃদ্ধ করেছিলেন রঘুনন্দন।শৈশবে গৃহদেবতা গোপীনাথকে নাড়ু খাইয়েছিলেন।মহাপ্রভু তাঁর  স্নেহধন্য রঘুনন্দনকে নীলাচলে দধিভান্ড ভঞ্জনের অধিকার দিয়েছিলেন।গৌরনাগরী তত্ত্বের আলোকে চৈতন্যমঙ্গল রচনা করেছিলেন  নরহরি শিষ্য লোচন দাস।ফলত নরহরি রঘুনন্দনের যৌথ নেতৃত্বে অখণ্ড বাংলাদেশে বৈষ্ণব ধর্মের প্লাবন এসেছিল।স্বয়ং মহাপ্রভু নিত্যানন্দের  প্রিয় ছিলেন নরহরি রঘুনন্দন।জগন্নাথের রথের সময় মহাপ্রভুর পরিমুণ্ডা কীর্তনে যোগ দিতেন শ্রীখণ্ডের বৈষ্ণবরা।।শ্রীনিবাস আচার্য মুরারিগুপ্তের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন গদাধর প্রিয় নরহরি।নিত্যানন্দ তাঁর গণসহ শ্রীখণ্ডে এসে মধুমতী-নরহরির কাছে মধু পান করেছিলেন।মধুপুস্করণী আজও তার সাক্ষ্য দিচ্ছে।

নরহরি যেমন সর্বপ্রথম গৌর-গদাই মূর্তির যুক্ত উপাসনা শুরু করেন তেমনি গোপাল দাসের শাখানির্ণয় থেকে জানা যায় তিনি প্রথম দারু বিগ্রহ নির্মাণ করে  বঙ্গে  বিধিবদ্ধ   গৌরাঙ্গপুজো শুরু করেছিলেন।কুলাই গ্রামের পদকর্তা বাসুঘোষের বাড়ির নিমগাছের কাঠ থেকে তিনটি গৌরনাগর মূর্তি বানিয়ে কাটোয়া শ্রীখণ্ডে এবং পূর্ববঙ্গের গঙ্গানগরে প্রতিষ্ঠা করেন।গঙ্গানগরের বিগ্রহটি বর্তমানে একচক্রাধামে পূজিত হচ্ছে।এই মূর্তির বৈশিষ্ট্য হলো মহাপ্রভুর নগর পরিক্রমার নৃত্যশীল রূপ।।রঘুনন্দনের পুত্র কানাই ঠাকুরের অন্যতম কৃতিত্ব শ্রীখণ্ডে বিষ্ণুপ্রিয়ার মূর্তি প্রতিষ্ঠা।শ্রীখণ্ডের ঠাকুরবাড়ি তিন মহলায় বিভক্ত।  উত্তরবাড়িতে পূজিত হচ্ছেন মদনগোপাল রাধারানী রাধামাধব।অন্যতম দর্শনীয়স্থান রঘুনন্দনের সূতিকাগৃহ।মাঝেরবাড়িতে  রাধামদনমোহন রাধাশ্যামরায় রয়েছেন। রয়েছে নরহরি সরকার ঠাকুরের ভজনকুঠীর।দক্ষিণবাড়িতে রাধাগোবিন্দজী ও মদনগোপাল।বিষ্ণুপ্রিয়া গৌরবিগ্রহ ও কূলদেবতা গোপীনাথ প্রতিমাসে  তিনবাড়িতে যথাক্রমে ১৫ ,৫ ও ১০ দিন সেবা পান।

নরহরি অনুরাগী শ্রীখণ্ডের অন্যতম বৈষ্ণবপদকর্তা ছিলেন শ্রীচন্দ্রশেখর বা শশিশেখর।শ্রীখণ্ডের খণ্ডেশ্বরীতলায় তাঁর বসতবাটিছিল।গৃহে পূজিত হতো রসিকরায় নামে এক সোনার বিগ্রহ।মোঘল-পাঠানের যুদ্ধের সময় মোঘলরা একসময় শ্রীখণ্ড আক্রমন করেছিল।উদ্ধত মোঘল সৈন্যরা কবির বাটি লুঠ করে রসিকরায় বিগ্রহকে অপহরণ করতে গেলে কবি প্রবল বাধা দেন।মোঘলসৈন্যরা কবির শিরশ্ছেদ করে। গৌরগুণানন্দ ঠাকুর শ্রীখণ্ডের প্রাচীন বৈষ্ণবসমাজ গ্রন্থে লিখেছেন–…মোগলেরা তাঁহার মস্তক কাটিয়া ফেলিলে ,সেই কাটা মুন্ড বারংবার ” নরহরির প্রাণ গৌর নাম উচ্চারণ করিতে করিতে অবসন্ন হইয়া পড়ে।”পৃ–১১৫। এই বিগ্রহ পরবর্তীকালে গুরুভাই দ্বিজ গোপাল দাস তকিপুরে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ষোড়শ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নরহরি সরকারের জীবনাবসান হয় কার্তিক মাসের কৃষ্ণা একাদশী তিথিতে। কিন্তু ভক্তিরত্নাকরে অগ্রহায়ণ মাস  উল্লেখিত আছে। ঠাকুর রঘুনন্দন ও শ্রীনিবাস আচার্যের নেতৃত্বে প্রথম বাৎসরিক মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঠাকুরবাড়ির প্রাঙ্গণে। নরহরি চক্রবর্তীর ভক্তিরত্নাকরের নবম তরঙ্গে এ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা রয়েছে।মহোৎসবে এসেছিলেন নিত্যানন্দ তনয় বীরভদ্র পুরূষত্তোম আচার্য ,রামদাস , কবিচন্দ্র, কবি কর্ণপু্‌র, কবি বলরাম দাস্‌,জ্ঞানদাস গোপাল আচার্য লোকনাথ পন্ডিত প্রমুখ বৈষ্ণব কবি মহান্তরা। প্রেমবিলাসের কবি লিখেছিলেন–

শ্রীখণ্ডেতে নরহরির অন্ত্যেষ্টি উৎসবে।

মহাসংকীর্তন আসি করিলেন সবে।।

এর পরের বৎসর থেকে নরহরির তিরোভাব তিথি বড়ডাঙার প্রাঙ্গণে পালিত হয়ে আসছে।প্রতি বত্সর গৌরবিগ্রহসহ গোপীনাথকে বড়ডাঙার মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়।আগের দিন চব্বিশ প্রহরের অধিবাস কীর্তন শুরু।পরের দিন নামযজ্ঞের সূচনা এবং গৌরগোপীনাথের বড়ডাঙার মন্দির উদ্দেশ্যে শোভাযাত্রা ।একাদশী তিথিতে গৌরগোপীনাথের উদ্দেশে মালসাভোগ,মধাহ্নে একাদশী অনুকল্পত্যাদি।পরেরদিন অন্ন মহোত্সব।নরহরির সূচক কীর্তন ও চৈতন্যমঙ্গল পালাকীর্তন।কুঞ্জভঙ্গ গান সমাপনান্তে গৌরগোপীনাথের পুনরায় শ্রীখণ্ডের মন্দিরে প্রত্যাবর্তন। এই উপলক্ষে বড়ডাঙায় একসপ্তাহ ধরে মেলা বসে।বিভিন্ন বৈষ্ণবসাধক মাহান্তসহ অগণিত মানুষের আগমন ঘটে।যাত্রা কবিগান লোকসংস্কৃতির আসর বসে।মেলায় হিন্দুমুসলমান উভয় সক্রিয় অংশগ্রহণ করে।মেলার অন্যতম আকর্ষণ কীর্তনগান আর নতুনগ্রামের দারুপুতুল– প্রেমানন্দে বাহুতুলে সংকীর্তনরত গৌরনিতাই।

ছবিঃলেখক

 


Share your experience
  • 48
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    48
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR.SWAPAN KUMAR THAKUR
ড.স্বপনকুমার ঠাকুর।গবেষক লেখক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।কৌলালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।