জাজিগ্রামের শ্রীনিবাস আচার্য ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার বিরল ব্যক্তিত্ব

Share your experience
  • 65
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    65
    Shares

স্বপনকুমার ঠাকুরঃভোরের রাস্তায়  কৃষ্ণনামে বিভোর হয়ে হেঁটে চলেছেন গঙ্গাস্নানে ।যেন এক অলৌকিক দিব্য পুরুষ।গায়ের রঙ কাঁচাসোনা।চাঁচর চিকুর। কপালে তিলক।কণ্ঠস্বরে  ঝরে পড়ে সুললিত সঙ্গীতসুধা।  গোরা নামে ঢল ঢল দু নয়নে সতত প্রেমাশ্রু।ইনিই যাজিগ্রামের সেই শ্রীনিবাস আচার্য।  এক অপুর্ব ছবি।আর এ ছবি এঁকেছিলেন  অন্তরঙ্গ সখা- শিষ্য রামচন্দ্র কবিরাজ শ্রীশ্রীনিবাসাচার্যপ্রভোরষ্টোকম গ্রন্থে।   শ্রীচৈতন্যজায়া বিষ্ণুপ্রিয়ার বিশেষ স্নেহধন্য ছিলেন এই আচার্য শ্রীনিবাস।

বস্তুত,শ্রীনিবাস ষোড়শ শতকের এক বিস্ময়কর বহুমুখী প্রতিভার বিরল ব্যক্তিত্ব।গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মপ্রচারক,শিক্ষক,ভাগবত পাঠক,পদকর্তা দক্ষসংগঠক রাজগুরু। অন্যান্য বৈষ্ণবীয় কবি সাধকরা যখন মহাপ্রভুর প্রেমপ্রবাহে অবগাহন করে নিজ পদবি বিলিয়ে দিয়ে’দাসে’ পরিণত হয়েছেন- তখন আশ্চর্য ব্যতিক্রম শ্রীনিবাস। বৈষ্ণবীয় প্রেমসুধায় নিমজ্জিত থেকেও  বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামী প্রদত্ত ‘আচার্য’ উপাধিতে আজও অমলিন উজ্জ্বল নক্ষত্র।

শ্রীনিবাসের আবির্ভাব  আনুমানিক ষোড়শ শতকের দ্বিতীয় দশক। দীনেশচন্দ্র সেন ড.রাধাগোবিন্দ নাথ প্রমুখরা ষোড়শ  শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর জন্ম দাবী করলেও   ভক্তিরত্নাকর প্রেমবিলাস অনুরাগবল্লী প্রভৃতি প্রাচীন গ্রন্থানুসারে  বিমানবিহা্রী মজুমদার অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় ,পুলীনবিহারী দাস জীমূতবাহন রায় প্রমুখ গবেষকদের মতে তাঁর জন্ম সন ১৫১৮/১৯ খ্রিষ্টাব্দের বৈশাখী পূর্ণিমায়।সেই হিসাবে তাঁর জন্মশতবর্ষ পাঁচশো বছরের  স্বর্ণালি দিগন্তে উদ্ভাসিত।কিন্তু কোথায় কী!   বিস্মৃতির অন্তরালে  আজও শ্রীনিবাসের নিবাস।অবশ্য বৈষ্ণব মহাজনগণ আবির্ভাব তিথিতে নয়;বরং পবিত্র প্রয়াণতিথির পুণ্যলগ্নে  জনগণমনের অধিনায়ক হয়ে ওঠেন–সমবেত স্মরণে মননে সমধুর  হরি সংকীর্তনে।হেমন্তের এই কার্তিকী শুক্লাষ্টমী বা গোষ্ঠাষ্টমীর তিথিতে তাঁর মহাপ্রয়াণ উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারেও সেজে উঠেছে   শ্রীপাট যাজিগ্রাম। বসেছে জমজমাট মেলা।

জন্মস্থান–অগ্রদ্বীপ সংলগ্ন নদিয়া জেলার চাখন্দিগ্রাম।বাবা গঙ্গাধর ভট্টাচার্য।আদিযুগের বিরল চৈতন্যভক্তদের মধ্যে একজন।কাটোয়ায় মহাপ্রভুর সন্ন্যাস গ্রহণের তিনি প্রতক্ষ্যদর্শী। প্রবল চৈতন্যভক্তির জন্য জনমানসে সুপরিচিত হয়েছিলেন চৈতন্যদাস নামে।মায়ের নাম লক্ষ্মীপ্রিয়া। নীলাচলে মহাপ্রভুর আশীর্বাদে শ্রীনিবাসের জন্ম।পরে পিতৃবিয়োগের জন্য মাতুলালয় যাজিগ্রামে পাকাপাকিভাবে বাস আমৃত্যুকাল।দুবার নীলাচল আর তিনবার বৃন্দাবন যাত্রা করেছিলেন।নীলাচলে শ্রীচৈতন্যদেবের সঙ্গে  সাক্ষাৎ ঘটেনি সত্য ,তবে গদাধর পন্ডিতের কৃপা পেয়েছিলেন। ষোড়শশতকের নরহরি সরকার রঘুনন্দন নিত্যানন্দপত্নী জাহ্নবাদেবী  অদ্বৈতঘরণী সীতাদেবী ,জয়মঙ্গলচাবুকধারী  অভিরাম ঠাকুর,বীরাচারি বীরভদ্র কার না প্রিয় পাত্র ছিলেন শ্রীনিবাস? বৃন্দাবনে ষড়গোস্বামীদের নিবিড় সাহচর্য ও স্নেহলাভ করে পেয়েছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক আর আত্মিক শিক্ষার পাঠ।আর এই সূত্রে আচার্য উপাধিও লাভ।পরবর্তীকালে বৃন্দাবনের সঙ্গে গৌড়ের নিবিড় সংযোগ করেছিলেন শ্রীনিবাস। বৃন্দাবন থেকে শ্যামদাস নরোত্তমসহ অমূল্যগ্রন্থরাজী নিয়ে আসছিলেন গৌড়বাংলার পথে।তারপরের ইতিহাস সকলের জানা।পথিমধ্যে মল্লরাজের দস্যুদল মূল্যবান রত্নভেবে গ্রন্থচুরি –শ্রীনিবাসের ভাগবতপাঠ– গ্রন্থউদ্ধার ও মল্লরাজকে দীক্ষাদান ইত্যাদি। ঘটনাগুলির  ঐতিহাসিকতা নিয়ে কম-বেশী বিতর্ক থাকলেও বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ঘটনাটির গুরুত্ব অপরিসীম।

মল্লরাজ বীরহাম্বীর ও রানী সুলক্ষণাকে দীক্ষাদান করলেন শ্রীনিবাস।এই প্রথম একজন বৈষ্ণব ধর্মপ্রাচরক রাজগুরুর সম্মান লাভ করলেন।শিখরভূমির রাজা হরিনারায়ণও দীক্ষা লাভের জন্য আগ্রহী হয়ে ওঠেন।কিন্তু তিনি রামভক্ত হওয়ার জন্য নিজে দিক্ষা দেন নি।তাঁর প্রভাবে  মল্লরাজ বীরহাম্বির ঘোরতর সাম্রাজ্যবাদী শাসক থেকে পরিণত হলেন বৈষ্ণব পদকর্তা চৈতন্যদাস। মল্লরাজধানী বনবিষ্ণুপুরে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে একের পর এক টেরাকোটা মন্দির।বন বিষ্ণুপুর হয়ে উঠলো দ্বিতীয় বৃন্দাবন।

বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসে       মল্লরাজবংশের উল্লেখযোগ্য  দুটি অবদান যথা মন্দিরস্থাপত্য আর উচ্চাঙ্গসঙ্গীত চর্চা। দুটিই শ্রীনিবাসের  পরোক্ষ প্রভাব পুষ্ট।।রানী সুলক্ষনার সঙ্গে যাজিগ্রামের এক ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।।তিনি গুরুদেবের জলবিহারের জন্য খনন করেছিলেন  এক সুবিশাল সরোবর।এর নাম ছিল রানিদিঘি।এই দিঘির পাড়েই ১৭৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে মারাঠাবর্গি ও নবাব আলিবর্দির বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল।এই যুদ্ধে মারাঠানায়ক  রঘুজি সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রানির দিঘি সিপাইদিঘি নামে সুপরিচিত হয়ে ওঠে।

মহাপ্রভুর তিরোধানের পর অখন্ড বাংলায় বৈষ্ণবধর্মের নানা দল উপদলের সৃষ্টি হতে থাকে। উল্লেখযোগ্যরা হলো নিত্যানন্দগোষ্ঠী অদ্বৈতগোষ্ঠী  শ্রীখণ্ডের নরহরিগোষ্ঠী ইত্যাদি। শুরু হয়েছিল মতবাদ জনিত কলহ।এছাড়া বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীদের অনেক ক্ষেত্রে আলাদা মতামত ছিল ।এইসব দল উপদলগুলিকে সর্বপ্রথম একত্রিত করেছিলেন শ্রীনিবাস আচার্য।বিশেষ করে কাটোয়ায় দাস গদাধরের ও শ্রীখণ্ডে নরহরি সরকারের প্রয়াণ উৎসব উপলক্ষে তৎকালীন বিরুদ্ধগোষ্ঠীগুলিকে একত্রিত করেছিলেন শ্রীনিবাস।যা  পরবর্তীকালে  খেতুরি সন্মেলনে  মহামিলনের ছবিটি  সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর নেতৃত্বে।

আজকের অখ্যাত এই যাজিগ্রামই সেদিন ছিল রাঢ়ের অন্যতম বৈষ্ণবনগরী।বৈষ্ণবশিক্ষাকেন্দ্রর যেন অক্সফোর্ড।শুধু বৈষ্ণবমহাজনেরাই নন;এসেছিলেন মল্লরাজ বীরহাম্বীর  ও রানী সুলক্ষণা। এখন শ্রীপাটের সেবাইত পূর্ণচন্দ্র মাহান্তের বংশধরেরা।পূর্ণচন্দ্রের কাছেই   একাধিকবার শুনেছিলাম শ্রীপাটের  অজানা ইতিহাস।একসময় যাজিগ্রামে  সহস্র ঘর যাজক শ্রেণীর ব্রাহ্মণের বসবাস ছিল।গ্রাম্যদেবী বটেশ্বরীচণ্ডী।রয়েছেন পঞ্চানন  ও কালিন্দী নামে শিব।পাটবাড়ির পূর্বে  বিখ্যাত চতুষ্পাটীডাঙা। এখানেই ছিল শ্রীনিবাস আচার্যের টোলবাড়ি।উত্তর দিকে ডালঢালাপুকুর।পূর্বমুখী মন্দির।মল্লরাজদের সেই মন্দির কবে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে।তারপরে কাশীমবাজারের রাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দি তৈরি করেন  মন্দির।সেও গেছে ভেঙে।এখন নতুন করে গড়ে উঠেছে দালানমন্দির।রয়েছে শ্রীনিবাস সেবিত  ছোট গৌর-নিতাই দারুবিগ্রহ। মদনমোহন রাধারানি।বংশীবদন শীলা,হেমলতা ঠাকুরানীর সেবিত গোপালবিগ্রহ। বড় গৌর নিতাই দারুবিগ্রহ-বর্ধমানরাজারা দান করেন ।সঙ্গে প্রায় সত্তর বিঘা ভূসম্পত্তি।ষড়ভূজ গৌরাঙ্গ ও বিষ্ণুপ্রিয়ার মুর্তি দান করেছিলেন নীহাররঞ্জন বন্ধ্যোপাধ্যায়। এছাড়া শ্রীনিবাসের ভজনগৃহ,বটবৃক্ষতলা দন্তধাবনগাছ,হেমলতার তমালতলা দর্শনীয় স্থান।শ্রীনিবাসের শিষ্যদের মধ্যে বিখ্যাত  ছয় চক্রবর্তী অষ্ট কবিরাজ আর ছয় ঠাকুর।  নিজ বংশধরেরা যাজিগ্রাম থেকে ছড়িয়ে পড়েছেন বাংলার বিভিন্ন জনপদে।এমনি এক দৌহিত্র বংশধর  বাঁকুড়ার কাঁখিল্যাগ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।তাঁর বাড়ি থেকে আবিস্কৃত হয়েছিল বড়ুচণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকাব্য।

ছবি–লেখক

 


Share your experience
  • 65
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    65
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR.SWAPAN KUMAR THAKUR
ড.স্বপনকুমার ঠাকুর।গবেষক লেখক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।কৌলালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।