সিংহবাহিনী দুর্গা- লক্ষ্মী সরস্বতী না থাকলেও কার্তিক গণেশ আছে!

Share your experience
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares

পালসেন আমলের পাথুরে মহিষমর্দিনী সিংহবাহিনী দুর্গা মূর্তি থেকে একালের লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ সমন্বিত দুর্গার পারিবারিক মূর্তি। দুর্গার এই মূর্তি শিল্পের বিবর্তনে ঠিক কোন সময় থেকে পুত্র কন্যাদের সংযুক্তি ঘটেছে? এ প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর নেই।তবে ক্ষেত্রসমীক্ষায় দেখা যায় মধ্যযুগের ধাতব দুর্গার মহিষমর্দিনী মূর্তিতে প্রথম সংযুক্তি ঘটে কার্তিক গণেশের। এর মূলে হয়তো প্রাচীন পার্বতী মূর্তির প্রভাব রয়েছে অগ্নিপুরাণ অনুসারে যাকে ললিতা বলা হয়।যার দৃষ্টান্ত কেতুগ্রামের বহুলাক্ষী বা দিগনগরের পার্বতী মূর্তি। এই মূর্তি দ্বয়ে পার্বতীর সঙ্গে শিশু কার্তিক ও গণেশ রয়েছে। লক্ষ্মী সরস্বতী বিহীন কিন্তু কার্তিক গণেশ মূর্তি যুক্ত সিংহবাহিনী ধাতব মূর্তি একসময় গোপভূম অঞ্চলে জনপ্রিয় ছিল।তেমনি এক মূর্তি আর পুজোর কথা লিখেছেন–অর্ণব ঘটক।

দ্বারিয়াপুরের সিংহবাহিনী দুর্গা

দ্বারিয়াপুরের চক্রবর্তী পরিবারের আদি কথা

গোপভূমের দ্বারিয়াপুরের বনেদি চক্রবর্তী পরিবার। পরিবারের আদিপুরুষ জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। অতি শৈশবে মাতৃহারা হলে  কয়েকমাস পরেই পিতা বিষ্ণুপদ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহের আয়োজন করতেই জগন্নাথের মাতামহ দেবপ্রসন্ন চট্টরাজ, নাতিকে পিত্রালয় পাত্রসায়র থেকে নিয়ে আসেন নিজের বাড়ী দ্বারিয়াপুরে। এখানেই মাতামহ এবং নিঃসন্তান মামা-মামীমার অভিভাবকত্বে বড় হতে থাকেন জগন্নাথ। মতামহ ও মাতুল উভয়েই তৎকালীন তর্কবাগীশপুর (অধুনা তকিপুর) টোলের পণ্ডিত ছিলেন। সেই সূত্রে জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ও পণ্ডিতির পাঠ নিতে শুরু করেন।

সিংহবাহিনী দুর্গা প্রাপ্তি

বেশ বছর খানেক পরে দ্বারিয়াপুর গ্রামে গ্রীষ্মকালীন জলসংকটের কারণে মাতুলের ইচ্ছায় একটি দীঘি কাটানোর উদ্যোগ নে’ন জগন্নাথ। সেই দীঘি কাটাতে গিয়েই অযাচিতভাবে দেবী দশভুজা সিংহবাহিনীর বিগ্রহ পান। বয়োজ্যেষ্ঠদের পরামর্শে ঐ বিগ্রহ বাসভবনেই প্রতিষ্ঠা করে নিত্যসেবা শুরু করেন জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। বছরখানেক পরে তাঁর মামা দেহরক্ষার আগে বৎসরান্তে শারদোৎসব আয়োজনের আদেশ দিয়ে যান। এ’ঘটনা আনুমানিক ৪৫০ বছর আগেকার। সিংহবাহিনীর বিগ্রহপ্রাপ্তির নীরব সাক্ষী সেই দীঘি আজ আর দীঘি নেই, ডোবা হয়ে গেছে(জগার ডোবা)।

 নবকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধস্তন চতুর্থ প্রজন্ম নবকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তৎকালীন বর্ধমানরাজের থেকে ‘রাজচক্রবর্তী’ উপাধিতে ভূষিত হ’ন। যদিও এই উপাধির পিছনে সঠিক কারণ কী ছিলো, তা জানা যায়নি। নবকুমারের পুত্র জগদীশ চক্রবর্তী জামগ্রাম জমিদারবাড়ীর নায়েব ছিলেন। এই সময় থেকেই কুলদেবী সিংহবাহিনীর নিত্যনৈমিত্তিক সেবায় কিছু নিয়ম আরোপিত হয় এবং শারদোৎসবে সিংহবাহিনীর সাথে সাথে মৃন্ময়ী সপরিবার দুর্গাপ্রতিমা আরাধনা শুরু হয়।

সিংহবাহিনী দুর্গা পূজা বিধি

বর্তমান প্রজন্মের যেসকল প্রতিনিধি রয়েছেন, তাঁরা কমবেশি প্রত্যেকেই স্বর্গীয় জগদীশ চক্রবর্তীর প্রবর্তিত নিয়ম যথাসাধ্য পালন করে চলেছেন। প্রত্যহ চারদফায় দেবীর নিত্যসেবা হয়। এখন দেবীর নিত্যপূজা বা শারদীয়া দুর্গোৎসব সবই পালাভিত্তিক ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। চক্রবর্তী পরিবারের সংবৎসরকালে সিংহবাহিনী সেবায় একটিই মাত্র বিশেষত্ব লক্ষ্যনীয়। শারদীয়া শুক্লাষষ্ঠীর সন্ধ্যায় দেবী নিজের ঘর থেকে দুর্গাবাড়ীতে এসে বসেন। এরপর বিজয়াদশমী অব্দি দেবী এখানেই থাকেন। ষষ্ঠীর সন্ধ্যা থেকে বিজয়াদশমীর সকাল অব্দি দেবীর যথাবিহিত স্নান, পূজা, ভোগ, আরতি হলেও শয়ন হয়না। একটানা তিনরাত্রি-তিনদিন দেবী দণ্ডায়মান অবস্থায় পূজা গ্রহণ করেন।

বিজয়াদশমীর সকালে ঘট-নবপত্রিকা বিসর্জন হয়ে গেলে তাঁকে নিজের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বিগ্রহের পায়ে ‘কর্পূর সহযোগে সর্ষের তেল’ গময় করে মালিশ করে শয়ন দেওয়া হয়। এই নিয়ম কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার আগেরদিন অব্দি চলে। এ’কদিন দেবী শুধু স্নানের জন্যই সিংহাসন থেকে নামেন, স্নান সেড়ে কাপড় পড়ে আবার শয্যায় যান। পারিবারিক বিশ্বাস একটানা তিনদিন-তিনরাত দাঁড়িয়ে থাকায় মায়ের পায়ে ব্যথা। তাই কোজাগরী পূজা অব্দি দেবী সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী অবস্থায় বিশ্রাম নে’ন।

সিংহবাহিনী দুর্গা

সিংহবাহিনী দুর্গা মূর্তির বৈশিষ্ট্য

এবারে সিংহবাহিনী বিগ্রহের প্রসঙ্গে আসা যাক। এই বিগ্রহটি অষ্টধাতু নির্মিত। দেবী দশভুজা মহিষমর্দিনী। চালচিত্র সমেত বিগ্রহের উচ্চতা সাড়ে নয় ইঞ্চি। দেবীর পার্শ্বদেবতা রূপে গণেশ এবং কার্তিক রয়েছেন। কিন্তু লক্ষ্মী সরস্বতী অনুপস্থিত। এইপ্রকার অদ্ভুত প্রতিমা আমাদের বঙ্গদেশে প্রায় বিরল। যদিও বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পালযুগীয় কিছু বিগ্রহে মহাদেবীর দুপাশে গণেশ কার্তিকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও, সেসব মূর্তিতে দেবী ললিতা রূপে বিরাজিতা, তিনি চতুর্ভুজা, সন্তানবৎসলা এবং মাতৃভাবে প্রতিষ্ঠিতা। সেসব বিগ্রহে তাঁর হাতে কোনো আয়ুধ নেই। কিন্তু এই বিগ্রহে, রীতিমতো যোদ্ধা বেশে দেবী মহিষাসুরকে মর্দন করেছেন। পাল/সেনযুগীয় বিগ্রহের সাথে এই বিগ্রহের একটিই সাদৃশ্য যে, কোনোক্ষেত্রেই দেবীর সাথে লক্ষ্মী ও সরস্বতী নেই।

আরও পড়ুন- একজটা তারাপূজা ও সোমরার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের ইতিকথা

এখানেই বিশেষজ্ঞদের কাছে জিজ্ঞাস্য, তবে দুর্গাদেবীর ‘সপরিবার বিগ্রহে’ লক্ষ্মী সরস্বতীর আনয়ন বা আরাধন ঠিক কোন সময় থেকে শুরু হয়! চক্রবর্তী পরিবারের সিংহবাহিনী বিগ্রহের একটি গঠনগত বিশেষত্ব গণেশ, কার্তিক এবং মহিষমর্দিনী এনাদের তিনজনই মূল ধাতব বেদীতে খিলানকব্জার সাহায্যে আটকানো অর্থাৎ, এনাদের আলাদা করে খোলা যায়।


Share your experience
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares

Facebook Comments

Post Author: অর্ণব ঘটক

অর্ণব ঘটক
অর্ণব ঘটকপিতাঃ শ্রীযুক্ত লক্ষ্মণদাস ঘটকমাতাঃ শ্রীমতী গোপা ঘটক পঠনপাঠনঃ গলসী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক(বানিজ্য বিভাগ)। বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে স্নাতক।কর্মসূত্রে ব্যবসায়ী হলেও, পিতার সংস্পর্শে ইতিহাস বিশেষতঃ প্রাচীন বঙ্গদেশের ইতিহাস, স্থানীয় লোক সংস্কৃতি, আঞ্চলিক ইতিহাস ইত্যাদি নিয়ে চর্চা করা একটি নেশা।