সীতাহাটী জমিদার বাড়ির দুর্গাপূজা

Share your experience
  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    12
    Shares

 

সৌগত চট্টোপাধ্যায়

 

সময় নদীর স্রোতের মতোই গড়িয়ে যায় অতীতের পানে। কিছু অতীত আশ্রয় নেয়  ইতিহাসের কালো অক্ষরের নিচে,আর কিছু অতীত আশ্রয় পাওয়ার আকাঙ্খায় প্রহর গণনা করে  দশকের পর দশক ধরে।এমনই এক আশ্রয়প্রার্থী অতীত হল সীতাহাটীগ্রাম। মধ্যযুগে যে গ্রামের পাশেই ছিল উত্তর রাঢ়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গ্রাম নবহাটি বা নৈহাটি পাশে । শ্রীচৈতন্যদেবের দীক্ষালাভের পূর্বে নৈহাটিকে কেন্দ্র করেই কাটোয়ার অবস্থান বোঝানো হতো।  সেন বংশের  সেই বিখ্যাত তাম্রশাসনটি নৈহাটির পাশে সীতাহাটিতেই পাওয়া গিয়েছিল, সেটি উদ্ধার করেছিলেন এই গ্রামের সন্তান তথা জমিদার শশাঙ্কশেখর চট্টোপাধ্যায়, তাঁর প্রসঙ্গে আমরা পরে আসবো। তার আগে জেনে নি কীভাবে সীতাহাটি রচিত বিরাট এক জমিদার বাড়ির ইতিহাস। যার সূচনা হয়েছিল বীরভূমের রামপুরহাটের কাছে বরশাল গ্রাম থেকে।

যতটুকু জানা গেছে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার নবাব আলীবর্দী খাঁর সময়েই এই বংশের উত্থান শুরু হয়।হলধর চট্টোপাধ্যায় ও ভূধর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন দুই ভাই।ভূধর চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ধর্মপ্রাণ সংসার ত্যাগী মানুষ। বণিক হলধরের সন্তান রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথম জীবনে নীলকুঠিরের ম্যানেজার ছিলেন। এরপর সীতাহাটি, কেউগুড়ি, রঘুপুর ,গুড়পাড়া ও মালীহাটি কাঁন্দরা এই ৫টি জায়গা নিয়ে সীতাহাটী জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নিকটবর্তী কাটোয়া শহরের অবস্থান এবং উন্নত যোগাযোগের কথা মাথায় রেখেই কল্লোলিনী জাহ্নবীর পশ্চিম পারে অবস্থিত সীতাহাটী গ্রামকে বেছে নেওয়া হয় জমিদারি পত্তনের জন্য। এই জমিদারির আবছায়া ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে এই বাড়ির দুর্গা পুজোর নানা গুরুত্বপূর্ণ ইতিকথা।

আনুমানিক ২৫০ বছরের পুরনো এই পুজোর সূচনার সঠিক সময়কাল আজও জানা যায় নাই।শোনা যায় এই বাড়ির জমিদারের আমন্ত্রণে সাধক বামাক্ষ্যপা কয়েক বার দুর্গাপুজোয় উপস্থিত ছিলেন।এই বাড়ির কুলগুরু জুড়ানপুরের যোগী পুরুষ শিবনাথ শাস্ত্রীর সাথে এই পুজোর নীবিড় সম্পর্ক ছিল। রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর জগবন্ধু চট্টোপাধ্যায় বেশ কিছু দিন জমিদারি চালান ,তারপর দায়িত্ব পান সীতানাথ চট্টোপাধ্যায়, তাঁর সময়ে জমিদারির জৌলুস চরমে ওঠে। পুজোর কদরও বাড়তে থাকে,এই গ্রাম লাগোয়া বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এখানে ভিড় জমাতো,মেতে উঠতো খাওয়া দাওয়া থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। চারদিনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান এক মিলন উৎসবে পরিণত হত।

এরপর চারুচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জমিদারির দায়িত্ব পান। তাঁর সময়কালের পর থেকেই কালের হাওয়া গ্রাস করতে থাকে জমিদারির গৌরবকে। পরবর্তী কালে বৈদ্যনাথ চট্টোপাধ্যায় জমিদারির দায়িত্ব নিলেও ফিরিয়ে আনতে পারেননি পুরনো গৌরবকে বরং পারিবারিক কলহ চরমে ওঠে । এরপর ১৯৪০–১৯৫৪ সাল পর্যন্ত প্রথমে দুর্গাদাস ও পরে শশাঙ্কশেখর চট্টোপাধ্যায় জমিদারি সামলান। তারপর চলে যায় জমিদারি। হারাতে থাকে পুজোর ঐতিহ্য জৌলুস সবই।অভাবের কালো ছায়া পড়তে থাকে মা জগদম্বার মমতাময়ী মুখে।

এই বাড়িতে মা দুর্গার পুজো হয় করুণাময়ী জগৎ জননী জগদম্বা রূপে। রঘুনাথ কুলদেবতা হওয়ার কারনে পুজো হয় বৈষ্ণব মতে, যে কারনে মহিষ থাকেনা এবং বলী প্রথার প্রচলন নাই। মহালয়ার দিন চক্ষু দান হয়,এবং চতুর্থীর দিন মা দুর্গাকে আটনস্ত করা হয় কয়েকশো বছরের পুরনো শালকাটের চৌকিতে এবং ডাকের সাজে সাজানো হয়। ষষ্ঠীর দিন সন্ধেতে দুর্গাকে মেয়ের মতো সাজানো হয় চাঁদির অস্ত্রতে,যা দেখার জন্য আজও ভিড় জমে দুর্গা দালানে। সপ্তমীর সকালে লালকিতে চাপিয়ে নবপত্রিকাকে ঝাউতলা ঘাটে স্নান করানো হয় এবং বরণ ও নান্দীমুখ করে পুজার সূচনা হয়। মহাষ্টমীর সন্ধিপূজার সময় বন্দুক ফায়ার করা হতো ,এখন সে সব রীতি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আজও ১০৮ পদ্ম এবং ১০৮ প্রদীপ  দেওয়া হয়এবং মহানবমীর বিশেষত্ব হলো হোমের উপর পুণ্যারতি ও কয়েক কেজি চাল দিয়ে তৈরি হয় মহানৈবেদ্য। বিজয়াদশমীর সকালে বাড়ির সকল সদস্য মিলে সিঁদুর খেলা হয় ও রাত্রি বেলায় গঙ্গা ঘাটে আরতি করে ভাসান দেওয়া হয় দুর্গাকে।

ছবি–লেখক


Share your experience
  • 12
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    12
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সৌগত চট্টোপাধ্যায়

সৌগত চট্টোপাধ্যায়
সৌগত চট্টোপাধ্যায় ।লেখক সীতাহাটি জমিদার বাড়ির সন্তান তথা ভূমিপুত্র। বর্তমানে চাকুরির পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, অবসরে লেখেন মানুষ, প্রকৃতি ও সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে মায়াবী গদ্য।