বিভিন্ন সরাপটে লক্ষ্মী

Share your experience
  • 15
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    15
    Shares

তিরুপতি চক্রবর্তীঃবাঙলার  লোকশিল্পে  একটি বিশেষ স্থান জুড়ে আছে মাটির সরা বা পট। হাঁড়ির ঢাকনার মতো দেখতে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে বানানো পোড়ামাটির সরা, যা পট নামে  খ্যাত। বাঙলার লক্ষীপুজোর সাথে এই পট যুক্ত। লক্ষ্মী হিন্দুদের ধন, সৌন্দর্য, সমৃদ্ধি ও জনন ঊর্বরতার দেবী। সকল হিন্দুগৃহে প্রতি বৃহস্পতিবার এই দেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হলেও দেবীর বার্ষিক পূজা হয়ে থাকে শারদ পূর্ণিমা রাতে। মাটির মূর্তি গড়ে, কেউবা পূর্ণকলস জলে আমের পাতা দিয়ে তার ওপর কলসের মুখে ডাব বসিয়ে রেখে লক্ষ্মীপূজা করে।

কোন কোন গৃহে, বিশেষ করে, অব্রাহ্মণ-গৃহে লক্ষ্মীপট বসিয়ে পূজা করা হয়। লক্ষ্মীপটে লক্ষ্মীর মূর্তি আঁকা থাকে। আমরা এই সরা বা পটের ৪টি ভাগের কথা মোটামুটি জানতে পারি ১) ঢাকাই সরা, ২)  ফরিদপুরি ৩) সুরেশ্বরী ৪)গনকী। এই মূল চার ধারার পট বানানো ও দেবীমূর্তির বিভাজনের নিরিখে তৈরী হয়েছে। বলাবাহুল্য এই সরার প্রচলন অধুনা বাঙলাদেশেই, ফলে ব্যবহারও বাঙলাদেশে। পরে এ দেশে চলে আসা তথাকথিত  নিম্নবর্গীয় মানুষের মধ্যে এর প্রচলন লক্ষ্য করা যায়।

নদীয়ার তাহেরপুর অঞ্চলে ৫০/৬০ ঘর মানুষ এই পটশিল্পের সাথে যুক্ত। তাদের প্রদত্ত  তথ্যের ভিত্তিতেই জানা যায় পারিবারিক পেশায় চলে আসা সরা বা পটবৈচিত্রের কথা। ৫০ বছর ধরে পট বানিয়ে আসা সুকুমার পাল বলছিলেন যে বর্তমানে এই পটের চাহিদা অনেকাংশে বেড়েছে। দেড় আনার পট আজ  প্রায় ৭০/৮০ টাকায় বিকোচ্ছে। কিন্তু হস্ত ও কুটির শিল্পের অন্তর্ভুক্ত হলেও সরকারি অনুদান সেভাবে তাঁরা পান নি। তবুও এই পারিবারিক পেশায় তারা প্রাণপাত পরিশ্রম করেন  লক্ষ্মীলাভের আশায়।

 

ঢাকাই সরা

বলাবাহুল্য এ ধরনের সরার উৎপত্তিস্থল ঢাকায়। এ সরার কানা বা চারদিকের কিনারা একটু উঁচু করা, যদিও এর উত্তল অংশটি খুব বেশি উঁচু নয়। উপরিভাগে সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়া থাকে। নারায়ণ ও লক্ষ্মীকে এই সরায় পরস্পরের মুখোমুখি দন্ডায়মান অবস্থায় দেখানো হয়। তাঁদের হাতে ধরা থাকে ধানের শিষ। ফসলের ডাঁটাসহ শিষ কনুইয়ের ওপরে উঠে আছে। হলুদ গোলাকার ফুলভরা একটি কদম গাছ শাখাসহ খিলানের মতো তাঁদের দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকে। লক্ষ্মী তাঁর পদ্মাসনে হাতে ফসলের ডাঁটা ধরা অবস্থায় আসীন থাকেন।আর তাঁর রত্নাধার ও বাহন পেঁচা থাকে তাঁর পায়ের কাছে।

 

(২) ফরিদপুরী– ফরিদপুর অঞ্চলে এ ধরনের সরার উৎপত্তি। এধরনের সরায় প্রতিমা অঙ্কনে স্থানবিভাজন ও পটভূমি সাদা রাখা হয়; ঢাকাই সরার মতোই কেবল সরার কানাটি উঁচু করা হয় না। অর্থাৎ এক্ষেত্রে শৈলীর তারতম্য রয়েছে।

 

(৩) সুরেশ্বরী- ফরিদপুরের একটি গ্রাম সুরেশ্বরে এ ধরনের সরার উৎপত্তি। এই সরার গোলাকার জায়গা পাঁচটি খাড়া প্রকোষ্ঠে ভাগ করা হয়। এসব ভাগের মধ্যভাগের প্যানেল অলঙ্কৃত করে প্রধান দেবীমূর্তি,লক্ষ্মী মূর্তির আকার অপেক্ষাকৃত বড়। মধ্যভাগের খাড়া প্যানেলটিকে আরও দুটি আয়তক্ষেত্রে বিভক্ত করা হয়। এর অপেক্ষাকৃত ছোট ঊর্ধ্ব প্রকোষ্ঠে দেখানো হয় দুর্গার স্বামী শিবকে। মধ্য প্যানেলের প্রকোষ্ঠ জুড়ে থাকেন প্রধান দেবীমূর্তি দুর্গা। তিনি সেখানে সিংহবাহনী অবস্থায় অসুরবধে নিয়োজিত। তাঁর সন্তানগণ- লক্ষ্মী ও গণেশ আছেন বাম পাশের দুই খাড়া প্রকোষ্ঠে, পঞ্চরত্ন মন্দিরের আকৃতিতে শীর্ষদেশে পদ্মকলি খিলান স্থাপত্য গাঠনিক উপায়ে স্থানবিভাজনকে আরও কুশলী করে তোলা হয়। সরায় সাদা রঙের প্রথম অনুজ্জ্বল পোঁচ কিংবা পটভূমি নিয়ে যা-ই করা হোক তা ঢাকাই বা ফরিদপুরী সরারই অনুরূপ।

 

 

(৪) গণকী– এ হলো হিন্দু সমাজের একেবারে নিম্নস্তরের লোকজনের ব্যবহৃত সাধারণ সরা বা লক্ষ্মীর পট। এই সরার পটভূমি ঘন লাল। সরার স্থানবিভাজনও করা হয়েছে অনুভূমিকভাবে, উপরের অর্ধাংশ অপেক্ষাকৃত বড়, নিচের অর্ধাংশ ছোট প্রকোষ্ঠে । সরার কানায় কালো রং দেওয়া। উপরের দিকের প্রকোষ্ঠে একটি অর্ধ বৃত্তাকার পুষ্প অলঙ্করণমূলক পটি বা বন্ধনী সংযোজন করা হয়েছে। এটি সরার কানা স্পর্শ করে আছে। পটের প্রধান দেবীমূর্তি হলেন দুর্গা ও তাঁর পরিবার। নিচের প্রকোষ্ঠে রয়েছেন লক্ষী ও তাঁর বাহন পেঁচা। পটচিত্রের দেবদেবীর পরিধানে দামী, রত্নময় পোশাক। প্রচুর সাদা রেখা, বিন্দু ও ছোপ সহকারে সরার অলঙ্করণের কাজ শেষ করা হয়েছে।

ছবি–লেখক

 

 

 

 

 


Share your experience
  • 15
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    15
    Shares

Facebook Comments

Post Author: tirupatikoulal

তিরুপতি চক্রবর্তী
তিরুপতি চক্রবর্তী।নদিয়ার শান্তিপুরের এই ক্ষেত্রগবেষক মূলত চিত্রগ্রাহক ও ক্ষেত্রসমীক্ষক।