শ্রীপাট গোস্বামী মালিপাড়া -দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়েরে দেবতা

Share your experience
  • 507
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    507
    Shares

শ্রীপাট গোস্বামী মালিপাড়া -দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়েরে দেবতা। লোক ইতিহাস কিংবদন্তী আর মানুষের দেবতা হবার কাহিনী।লিখছেন–শুভদীপ সিনহা।

বিগ্রহ ও শ্রীপাট গোস্বামী মালিপাড়া

শ্রীপাট গোস্বামী মালিপাড়া- লুপ্তনদীর চর জনপদ

গোস্বামী মালিপাড়া হুগলী জেলার পোলবা থানার অন্তর্গত একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। সুদূর অতীতে এই গ্রামের ভূভাগ প্লাবিত করে কেদারমতী নদী প্রবাহিত হত। এই নদী এখনো ক্ষীণাকারে একটি খালের রূপ নিয়ে গোস্বামী-মালিপাড়া ও দাঁতড়া গ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যখন এই নদী খুব বেগবতী ছিল, তখন পারাপারের জন্য দুই তীরে দুটি ঘাট নির্দিষ্ট ছিল। সেই দুটি ঘাটের উত্তর দিকে দ্বারবাসিনীতে শ্রীশ্রীবিষহরি দেবী ও দক্ষিণ দিকে সানিহাটে শ্রীশ্রীবিশালাক্ষ্মী দেবী আজো প্রতিষ্ঠিত আছেন। এদের সেবার জন্য কুচপালের নবাবের জমি দান করা আছে। কালান্তরে এই নদীগর্ভে যে চর বের হয়, সেই চরে রাজা দ্বারপালের পুষ্পদ্যান হয়েছিল এবং রাজার মালিরা সেই চরে বাস করত বলে, এটি মালিপাড়া নামে খ্যাত হয়।

 মহাপ্রভুর পরিকর

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্যতম পার্ষদ শ্রীপাদ খঞ্জ ভগবান আচার্য্যের সময় থেকে গোস্বামীগণ এইখানে এসে বসবাস আরম্ভ করেন এবং গোস্বামীদের প্রাধান্যের জন্য একই স্থান গোস্বামী-মালিপাড়া বলে পরিচিত হয়। ভগবান আচার্য্য গৃহাশ্রমে থাকার সময় তাঁর পৈত্রিক বিগ্রহ শ্রীশ্রীলক্ষ্মীজনার্দন, শ্রীশ্রীবৃদ্ধামাতাজীউ, নিজের পূজিত প্রিয়াজীসহ কেশবলাল জীউ ইত্যাদি বিগ্রহের পূজা মালিপাড়ায় প্রবর্তন করে এই স্থানে প্রেম, দীক্ষা, শিক্ষা প্রবর্তনের বীজ বপণ করেন। তাঁকেই আধুনিক গোস্বামী-মালিপাড়ার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়। বাংলার বৈষ্ণব-সংস্কৃতিতে আজো তাঁদের প্রভাব অক্ষুন্ন আছে। বস্তুত মহাপ্রভুর সময় থেকেই বাংলাদেশে তাঁদের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল। আজো এই গ্রামের সুন্দর পরিবেশ দেখলে মন ভরে যায়।

শ্রীপাট গোস্বামী মালিপাড়া বিগ্রহ সমূহ

গোস্বামী-মালিপাড়া গ্রামে শ্রীশ্রীমদনগোপাল জীউ ও রাধাকান্তজীউর মন্দির বাংলার প্রাচীন বৈষ্ণব মন্দিরগুলির অন্যতম। শ্রীপাদ বল্লভ গোস্বামী মদনগোপাল জীউর মন্দির প্রতীষ্ঠা করেন। এই মন্দিরের মধ্যে প্রিয়াজী সহ রাধাবল্লভ ও রাধা, মদনগোপাল এই যুগল মূর্তি বিরাজ করছেন। এ ছাড়া গোস্বামী বংসের বংশীবাদন শালগ্রাম এবং শ্রীশ্রীবৃদ্ধমাতা নামের কালিকাশিলা প্রতিষ্ঠিত আছেন। একটি মন্দিরের মধ্যে দুটি যুগল মুর্তি সাধারণত দেখতে পাওয়া যায় না। এই যুগল মুর্তি থাকারও একটি ইতিহাস আছে।

মদনগোপালজীউ

বল্লভ গোস্বামী সবার আগে প্রিয়াজীসহ রাধাবল্লভকে এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। এর অল্পদিন পরে মৃত্যুঞ্জয় ব্রহ্মচারী নামে তাঁর এক শিষ্য তাঁর কুলদেবতা মদনগোপালজীর বিগ্রহ নিয়ে এই গ্রামে তাঁর গুরুগৃহে আসেন। তিনি রাধাবল্লভ দর্শন করে স্নান করতে যান। স্নানের পর বাড়ি যাওয়ার সময় তিনি আর মদনগোপালকে মন্দির থেকে ওঠাতে পারেননি। পরে তিনি মদনগোপালের স্বপ্নাদেশ পান, তিনি এই স্থানেই থাকবেন, অন্য কোথাও যাবেন না। ব্রহ্মচারী এতে ব্যথিত হয়ে ত্রিবেণীতে গিয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেন। বল্লভ গোস্বামী মশায় মদনগোপালকে রাধাবল্লভের পাশে রেখে যথাবিধি সেবাপুজো করতে থাকেন এবং অচিরেই ঠাকুরের কৃপালাভ করেন।

শ্রীপাট গোস্বামী মালিপাড়া রাধাকৃষ্ণের বিয়ে

কথিত আছে, বিগ্রহের সাথে নাকি তাঁর কথোপকথন হত। পরে স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে গোস্বামী মশায় রাধারাণী বিগ্রহ তৈরি করে মদনগোপালের সাথে বিয়ে দেন এবং মন্দিরে যুগল সেবার ব্যবস্থা করেন। এই মন্দিরের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো একটি পালকি আছে। এই পালকি করে দুই যুগলমূর্তি রাসের সময় রাসমঞ্চে এবং রথযাত্রার সময় রথে আরহণের জন্য যান। মন্দিরের বাইরে বল্লভ গোস্বামী মশায়ের পুষ্পসমাধি আছে। আজো তাঁর তিরোভাব মহোৎসব সপ্তাহ ব্যাপী ধরে এই মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়। গোস্বামী মশায়ের শিষ্যদের দ্বারা এই মন্দির বারবার সংস্কার হয়েছে। ১২৮৫ বঙ্গাব্দে শ্রীনন্দকিশোর গোস্বামী নাটমন্দিরে শ্বেতপাথর বসিয়ে দেন। মন্দিরের পাশে দূর থেকে উৎসবের জন্য আগত বৈষ্ণবদের থাকার জন্য ঘর আছে। মন্দিরের যাবতীয় পুজো ও উৎসব ট্রাস্টি দ্বারা বর্তমানে পরিচালিত হয়।

আরও পড়ুন- ভূতের পালকি ভূতের আলপনা বড়োই অদ্ভুত বাংলার লোকসংস্কৃতিতে

শ্রীপাট গোস্বামী মালিপাড়া – বড়ালের ঝি

গোস্বামী মালিপাড়ার দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য মন্দির শ্রীশ্রীরাধাকান্তজীউর মন্দির। শ্রীপাদ ভাগবতানন্দ গোস্বামী এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। কিংবদন্তী এটাই যে, প্রিয়াজীসহ রাধাকান্ত বিগ্রহ মহারাজ প্রতাপাদিত্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অয়েছিল। এই বিগ্রহ আগে পোলবা নিবাসী শ্যামরায়ের গৃহে পুজিত হতেন। শ্রীপাদ ভাগবতানন্দ গোস্বামী স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই বিগ্রহ গোস্বামী মালিপাড়া গ্রামে এনে প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিত্যসেবা ও ভোগের ব্যবস্থা করেন। এর কিছুদিন পরে জনৈক বটব্যাল উপাধিধারী ব্রাহ্মণ তাঁর কন্যাকে নিয়ে এই মন্দিরে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁর কন্যার এই মন্দিরেই মৃত্যু হয়। কন্যার মৃত্যুতে ব্রাহ্মণ বিশেষ কাতর হয়ে পরেন। তখন ভগবতানন্দের প্রতি স্বপ্নাদেশ হয় যে, ব্রাহ্মণ কন্যা জড়দেহ ত্যাগ করে আমার প্রিয়াজী হয়েছে সুতরাং ব্রাহ্মণকে শোকত্যাগ করতে বল এবং তাঁর কন্যার একটি ধাতুময়ী প্রতিমূর্তি গঠন করে আমার পাশে স্থাপন কর। এই মূর্তি আজো ‘বড়ালের ঝি” নাম নিয়ে রাধাকান্ত জীউর বাঁ পাশে বিরাজ করছেন।


Share your experience
  • 507
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    507
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ সিনহা

শুভদীপ সিনহা
শুভদীপ সিনহা।সরকারি আধিকারীক।ক্ষেত্রসমীক্ষক ও লোকসংস্কৃতি চার্চায় বিশেষ আগ্রহী।