সুবচনীব্রত বা শুভচণ্ডীর পুজো হয় পূর্ববঙ্গে বিয়ের অষ্টমঙ্গলায়

Share your experience
  • 289
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    289
    Shares

সুবচনীব্রত
সুবচনীব্রত

সুবচনীব্রত অনেকের মতে শুভ চণ্ডী। বাংলার এক পরিচিত দেবী । যদিও এই দেবীর বাৎসরিক পূজার বিশেষ প্রচলন বাঙালি সমাজে নেই,। ছেলে বা মেয়ে র বিবাহের পরে নবদম্পতির মঙ্গল কামনায় এই ব্রত করা হয় । পূর্ব বঙ্গীয় সমাজে সাধারণত বিয়ের আট দিনের মধ্যে কোনো শনি বা মঙ্গল বার ভোর বেলা এই ব্রত করা হয় । লিখছেন–ময়ূখ ভৌমিক।

 

সুবচনীব্রত

কোনো পুরোহিতের প্রয়োজন সাধারণ ভাবে দেখা না গেলেও পরিবার ভেদে পুরোহিত দিয়ে পূজাও হয়ে থাকে ।পাঁচ বা সাত জন সধবা মহিলা বাড়ির উঠানে আল্পনা দিয়ে একটি ঘট স্থাপন করে । ঘটের কোলের কাছে (সামনে )একটি পাথর কে আগাগোড়া তেল সিঁদুর দিয়ে রাঙিয়ে বসানো হয় । এটি দেবীর প্রতীক । পাথরের সামনে, আল্পনা মন্ডলের ভিতরে, একটি ছোট গর্ত খোঁড়া হয়, একে “দুধপুকুর” বলে ।এবার , ঘটের দুই ধার দিয়ে সারি সারি জোড়া হাঁস আঁকা হয়, ও একটি কলা তে সিঁদুর দিয়ে চোখ, ঠোঁট, ডানা একে, তলার দিকে পাটকাঠির টুকরো গুঁজে পা বানিয়ে, দুধ জল দিয়ে ভর্তি গর্তে ছাড়া হয় ।

লক্ষণীয়, পা হয় একটি, কারন ব্রতকথা অনুযায়ী সুবচনী দেবীর কৃপা ধন্য হাঁস টি ছিল খোঁড়া ।এবার একটি থালা বা নতুন কুলায় এক ছড়া কলা (এটিতে জোড়া সংখ্যায় কলা থাকতে হবে ), পান, গোটা সুপারি, বাতাসা, তেল, সিঁদুর, ইত্যাদি ও একটি আলাদা পাত্রে খই, মুড়কি, নাড়ু, দই, মিষ্টি, ফল মূল ইত্যাদি দিয়ে ফুল বেলপাতা সহযোগে পুজো করে ব্রত কথা শোনা হয় ।

সুবচনীব্রত ও  নবদম্পতি

এই পুরো সময় ধরে, নবদম্পতি বিয়ের মুকুট পরে বিয়ের সময় ব্যবহৃত পিঁড়ি তে বসে থাকে । পূজা ও ব্রতকথা শোনা শেষ হলে সমবেত মহিলাদের ব্রতিনি (এক্ষেত্রে যিনি ব্রতকথা পাঠ করলেন )মাথায় সিঁদুর তেল দিয়ে ও হাতে পান সুপারি দিয়ে ব্রত শেষ করেন । এরপর সমবেত মহিলারা ধান দূর্বা দিয়ে নবদম্পতি কে আশীর্বাদ করে ও নব বধূ র সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে “জন্ম এয়োস্ত্রী ” হবার কামনা করে ।

সুবচনীব্রত ও উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজ

উত্তর বঙ্গের রাজবংশী সমাজেও এই ব্রত পালন হ।, তবে কিছু  ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় ।পূজায় পান সুপারি ইত্যাদির  সাথে তামাক পাতা ও যাত্রা পাতা নামক বিশেষ এক ধরনের পাতা দেবার রীতি দেখা যায় ।এছাড়া একটি কাটারি সিঁদুর লিপ্ত করে ঘটের পাশে রাখা থাকে। পূজা শেষে এটা ব্রতিনি নিজের পেছন দিকে না দেখে ছুড়ে মারে । বিশ্বাস করাহয় এভাবে সমস্ত বাধা বিপদ কেটে যাবে l পূজার জায়গায় একটি কলার আগপাতার ওপর দুটি হাঁসের ডিম সিঁদুর ফোঁটা দিয়ে রাখা হয় l যা ঊর্বরতা বাদের সাথে এই পুজোর সম্পর্ক মনে করায়।

যাদু বিশ্বাস

বস্তুত, বাঙালির নিজস্ব সমস্ত পূজা পার্বনের মতো এটিও প্রধানত উর্বরতা বাদ ও প্রাচীন জাদুবিশ্বাস সম্পর্কিত বলে মনে হয় lর ব্রতকথা, বিভিন্ন আচার, পূজার উপচার এবং সর্বপরি মহিলাদের দ্বারা সমস্ত অনুষ্ঠান টি পরিচালনা দেখে এই ধারণা আরও পাকা পোক্ত হয়। বচনী বা শুভ চণ্ডী ব্রতের কথা টি হলো, এক গরীব ব্রাহ্মণকীশুভ চণ্ডী বা সুবচনী ব্রতের কথা টি দেখলে বোঝা যায় এটি এমন একটি সমাজের ব্রত, যেখানে ব্রাহ্মণ রাও মাংস খায় । অর্থাৎ পূর্বভারতীয় বা বাঙালি । আবার গল্পের মধ্যে মৃত হাঁসের জীবন প্রাপ্তি, ইত্যদি দেখে এটি যে প্রাচীন যাদু বিশ্বাস থেকে উদ্ভূত তা পরিষ্কার ।

সুবচনীব্রত কাহিনী

কোনো এক দেশের এক বিধবা ব্রাহ্মণী একমাত্র পুত্র কে নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতোএকদিন ছেলেটি পাঠশালায় গিয়ে অন্য বালকদের মুখে মাংস খাবার কথা শুনে এলো এবং বাড়ি এসে মায়ের কাছে মাংস খাবার আবদার করলো ।ব্রাহ্মণী নিজের  অক্ষমতা   জানালে, ছেলে বললো আমি তোমাকে কাল মাংস এনে দেব ।

খোঁড়া হাঁস

পরদিন ভোর হতেই ছেলে টি নগর ভ্রমণে বেরলো । সেই দেশের রাজার ছিল বিশাল হাঁসের পাল l হাঁসের পালে একটি হাঁস ছিল খোঁড়া, তাকে রাজা খুব ভালোবাসতো । প্রতিদিন নিজের হাতে রাজা খোঁড়াকে খেতে দিত ।ঘটনাচক্রে ব্রাহ্মণ কুমার সেই খোঁড়া হাঁসটি কেই ধরে বাড়ি নিয়ে গেল । মায়ের অনেক আপত্তি সত্যেও সে ওই হাঁসটিকে মেরে খেলো। আর পাখা, হাড়, ইত্যাদি বাড়ির পাশে ছাই গাদায় ফেলে দিলো । এদিকে সন্ধ্যায় রাজা খোঁড়া হাঁসকে না ফিরতে দেখে দারুন রেগে গেলেন ও হাঁস রক্ষক দের নির্দেশ দিলেন যেখান থেকে হোক হাঁস চোরকে ধরে আনতে হবে নইলে তাদের ছাল তুলে নুন দেওয়া হবে ।

সুবচনীর দয়া

ভয়ে সব হাঁস রক্ষক রা প্রানপনে চোর খুঁজতে লাগলো আর ব্রাহ্মণী্র বাড়ির পাশে হাঁসের পালক, পাখা ইত্যাদি দেখে ব্রাহ্মণ কুমাকে চোর বলে ধরে নিয়ে গেলো ।নিরুপায় ব্রাম্হনীর কান্না শুনে মা সুবচনীর দয়া হলো, তিনি বৃদ্ধা র বেশে এসে ব্রাম্হনী কে সুবচনী ব্রত করতে শিখিয়ে দিলেন ও ব্রত শেষে ব্রতের পুকুরের দুধ জল মৃত হাঁসের হাড় এ ছিটিয়ে দিতে বললেন ।
ব্রাহ্মণী সেই মতো করতেই মৃত হাঁস জ্যান্ত হয়ে রাজবাড়ী চলে যায় ।

এদিকে রাজা ব্রাহ্মণ কুমারকে হাত পা বেঁধে, বুকে পাথর দিয়ে কারাগারে রাখতে বলে ঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়লেন । শেষ রাতে মা সুবচনী স্বপ্নে দেখা দিয়ে রাজা কে বললেন, তোমার খোঁড়া হাঁস জীবিত আছে, কাল সকালে তাকে হাঁসের গোয়ালে দেখতে পাবে । আর ব্রাহ্মণ কুমার আমার ব্রত দাস, তাকে মুক্তি দিয়ে রাজকন্যা র সাথে বিয়ে দেবে ও অর্ধেক রাজত্ব যৌতুক দেবে । নইলে আমার কোপে রাজ্য নষ্ট হবে আর তুমিও নির্বংশ হবে ।

রাজা স্বপন দেখলেন

স্বপ্ন দেখে রাজা চমকে উঠলেন । সকাল হতেই দেখলেন খোঁড়া হাঁস পুকুরে খেলছে ।তখন ব্রাহ্মণ কুমার কে মুক্ত করে রাজকন্যা র সাথে বিয়ে দিলেন, অর্ধেক রাজত্ব যৌতুক দিলেন, চোদ্দ মাদল বাজিয়ে হাতির পিঠে বসিয়ে মেয়ে জামাই কে বিদায় করলেন ।

আরও পড়ুন-প্রবাদ প্রবচনে পূর্ববঙ্গের স্মৃতি

ব্রতের প্রচার

এদিকে গরীব বামনী তো এসবের কিছু ই জানে না । মনের দুঃখে কাঁদছে আর মা সুবচনীকে ডাকছে । হঠাৎ বাড়ির কাছে তুমুল বাজনা বাদ্যি শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখে তার ছেলে রাজকন্যা বিয়ে করে অর্ধেক রাজত্ব যৌতুক নিয়ে ফিরে এসেছে । তখন বামনী ছেলে বৌ দাড় করিয়ে রেখে আগে সুবচনী পূজা করলো, পরে ছেলে বৌ বরণ করে ঘরে নিল । সেই থেকে এই পুজো প্রচার হয়ে পড়লো ।


Share your experience
  • 289
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    289
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ময়ুখ ভৌমিক

ময়ুখ ভৌমিক
ময়ূখ ভৌমিক।কোচবিহারে থাকেন।হোমিওপাথি চিকিৎসক।নেশা ক্ষেত্রগবেষণা।