সুরেশ্বরী সরা’য় সুরেশ্বরী লক্ষ্মী

Share your experience
  • 51
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    51
    Shares

দীপঙ্কর পাড়ুই

 

একটা দশকর্মার দোকানের পাশে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি চা খাব।তারপর সরাগ্রামে যাব।এক সপ্তাহ পরেই লক্ষ্মীপুজো। সরার খোঁজে এসেছি নদীয়ার তাহেরপুরে।সরাগ্ৰামে আগেও এসেছি কিন্তু এবার অন‍্য কৌতূহল নিয়ে। তা হল  লক্ষ্মীদেবীকে সরার নীচে কেন আঁকা হয় ও অনান‍্য বিষয় নিয়ে।

পাঁচালী আছে… বেশ জোড় গলায় এক মহিলা বললেন। লক্ষ্মীর পাঁচালী।দোকানদার বললেন আছে।হাতে পাঁচালী এলো।মহিলাটি বললেন এটা না,হলুদ রঙের’ডা নাই।দোকানদার আবার খুঁজে দিলেন।হলুদ রঙের প্রচ্ছদ সমন্বিত একটি পাঁচালী বই দিলেন।বইয়ের উপর লেখা ‘ শ্রী শ্রী  লক্ষ্মীদেবীর পাঁচালী ও ব্রতকথা, জনৈক বরিশালবাসী’।আগ্ৰহের স্বরে মহিলার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম এটা কি আলাদা কোনো   বই,অন‍্য পাঁচালীর থেকে কি আলাদা।ভদ্রমহিলা বললেন-হ‍্যাঁ এটা পূর্ববঙ্গের লোকেরা ব‍্যবহার করেন। লক্ষ্মীর  শতনাম রয়েছে।শতনাম,সে তো কৃষ্ণের হয় জানি!ভদ্রমহিলা বললেন – শুধু কৃষ্ণের নয়,অনেক দেবতার শতনাম হয়।বললাম কেমন!মহিলা বললেন- শিব, বিষ্ণু, কালী, লক্ষ্ণীর…।অবাক হয়ে বললাম তাই নাকি!ওনি বললেন শাস্ত্রে আছে।তক্কে তক্কে ছিলাম,কথাটা প্রায় জিজ্ঞেসই করে ফেললাম।আপনাদের কি ঠাকুর বসিয়ে পুজো হয়!ভদ্রমহিলা বললেন না। আমাদের বংশ পরম্পরায় সরা বসিয়ে পুজা হয়।সরা বলাতে বললাম আপনারা পূর্ববঙ্গের কোথায় থাকতেন।ভদ্রমহিলা বললেন-মাদারিপুরের,সুরেশ্বর।কিছু যদি মনে না করেন আপনার বাড়ির পুজিত সরাটা দেখা যাবে।মহিলা বললেন হ‍্যাঁ তবে একটু যেতে হবে।বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে মহিলা পরিচয় দিলেন-চায়না পাল(৫০),স্বামীর নাম রতন পাল।চায়নাদি বললেন-আমরা সরা নিজেরাই বানায় কিন্তু পুজা করি অন‍্যসরা’য়।দেখলাম সবুজরঙা ব‍্যাকগ্ৰাউন্ডের উপর লম্বালম্বি ভাবে,চালচিত্রের মত করে,নীচে আঁকা দুর্গা ও তার পরিবার।আর একদম নীচে  লক্ষ্মী।বর্ণনা দিতে দিতে দিদি বললেন এটা সুরেশ্বরী সরা,আর নীচে ঐ যে লক্ষ্মী দেখছেন,ওটা সুরেশ্বরী লক্ষ্মী।

 

সরা

সরা মানে আমরা সাধারনত জানি মাটির তৈরি এক ধরনের পাত্র বা ঢাকনা।সরার উপরিতলে যে ছবি আঁকা হয় তাকে বলে সরাচিত্র।সরাচিত্র রীতিগত ভাবে লোকশিল্পের অন্তর্গত ।
লোক থেকেই উদ্ভুত শিল্পকেই আমরা সাধারনত লোকশিল্প বলি।লোক শিল্প একক ভাবে গড়ে ওঠে না।গোষ্ঠীজীবন থেকে উঠে আসে লোক শিল্প।মানুষের  উদ্ভাবনী ক্ষমতার মধ‍্য দিয়ে এই শিল্প গড়ে ওঠে।সেখানে অন‍্যশিল্পের সাথে লোকশিল্পের কোনো তফাৎ নেই।লোকশিল্পের কোন আন্তর্জাতিক স্টাইল  এর নেই।এর মধ‍্যে রয়েছে এক অভূতপূর্ব সারল‍্য। সরাকে সমস্ত জায়গায় লক্ষ্মীসরা বলা হয়ে থাকে।সরার উৎপত্তি মূলত বাংলাদেশের ঢাকা, ফরিদপুর, বড়িশাল জেলায়।সরা তৈরি করেন কুম্ভকার ,পাল সম্প্রদায়ের লোকেরা।সরা খুব উল্লেখযোগ‍্য স্থান দখল করেছে বাঙলীর মনে।ফরিদপুরের সুরেশ্বরী সরার বিশ্বে স্থান করে নিয়েছে রঙের বিন‍্যাস ও সরু রেখার জন‍্য।দেশভাগের আগে বা পরে কিছু সরাশিল্পী পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন এবং বিভিন্ন জায়গায় তারা ছড়িয়ে পড়েন।এরকম জায়গিগুলি হল  নদিয়া জেলার তাহেরপুর,দক্ষিণ ২৪ পরগনার পানিহাটি, সোদপুর,দত্তপুকুর,হাওড়া ইত‍্যাদি।বাংলার সরাশিল্পের অনেকগুলি ভাগ রয়েছে মুলত গঠনবিন‍্যাস,রঙলেপন এবং নকশা অনুযায়ী এই ভাগ করা হয়।সরা চার ধরনের হয়।এ প্রসঙ্গে হীরেন্দ্রনাথ মিত্র উল্লেখ করছেন-“পূর্ব বাংলার  লক্ষ্মীসরায় মূলত চারটি ঘরানার সন্ধান আমি পেয়েছি।১.সাধারন ফরিদপুরী ২.সুরেশ্বরী ৩. আচার্যী বা গনকী এবং ৪.ঢাকাই।”

সুরেশ্বরী সরা

বাংলাদেশের মাদারীপুরের অন্তর্গত সুরেশ্বর জেলায় এই রীতির সরা গড়ে উঠেছে বলে এ সরার নাম বা রীতির নাম সুরেশ্বরী সরা।সরাটির অঙ্কন প্রণালী লম্বালম্বি বিন‍্যাসে (ভার্টিক‍্যালি) আঁকা হয়ে থাকে।এ সরার পাশ্বদৃশ‍্য বা ব‍্যাকগ্ৰাউন্ড দুটি ভাগে বিভক্ত উপরে দুর্গা ও তার পরিবার।দুর্গার পরিবারের পিছনে চালচিত্রের মত প‍্যানেল আঁকা হয়।দুর্গার মাথার উপর শিব অবস্থান করেন।নীচে  লক্ষ্মী।তিনটে ঘর হয় মাঝেরটিতে পেঁচা ও  লক্ষ্মীদেবী।পাশের ঘর দুটিতে জোড়া ময়ূর দেখা যায়।আবার কখনও জয়া ও বিজয়া নামে দেবীদের দেখা যায়।সুরেশ্বরী সরার শেষ প্রতিনিধি ছিলেন সুনীল পাল।দু’বছর হল তিনিও গত হয়েছেন। পেয়েছিলেন একাধিক সন্মান।থাকতেন সোদপুরের পানিহাটী অঞ্চলে।

ঐতিহাসিক পেক্ষাপট

কখনও কখনও পূর্বপুরুষ কিছু অনুষঙ্গ ছেড়ে যান।সেই লুকিয়ে থাকা অনুষঙ্গটির ইতিহাস যদি উদ্ঘাটন করা যায় তাহলে আমাদের শিকড় উঠে আসে।আমার কৌতূহল ছিল সরার নীচের জায়গাটির দেবতা সম্পর্কে।এই দেবতাটির গঠন বিন‍্যাসটি খুব ছোট।জায়গা ছোট বলেই কি  তাড়াতাড়ি করে আঁকা হয়।তা কিন্তু নয়,নয় তার কারন এই ছোট্ট জায়গাটির মাপ হচ্ছে সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ ৪ ইঞ্চি-৬ ইঞ্চি।আমরা যদি প্রাচীন সরাচিত্র দেখি তাহলে এই জায়গাটির দেবতার ড্রয়িং অত‍্যন্ত  সূক্ষ্ম।আর সুরেশ্বরী সরা বিখ‍্যাত সরু রেখাঙ্কনের জন‍্য।কিন্তু এই যে দ্রুত উজানি সূক্ষ্ম রেখার ধারাটি কোথা থেকে এল।এ প্রসঙ্গে আমরা যদি একটু পাল ও সেন যুগের বৌদ্ধ আমলের পুঁথিচিত্র গুলি দেখি তাহলে দেখব সেই দ্রুত উজানি  সূক্ষ্মরেখার প্রচলন সেই ফিগার বা অববয়ব গুলির সঙ্গে সাদৃশ‍্য রয়েছে।এ অনুষঙ্গ আনছি তার কারন বাংলায় ছিল পাহাড়পুর  বা রামপাল,মোগলমারী বৌদ্ধবিহার।এ সমস্ত বৌদ্ধ বিহারে পুঁথি লেখার চল ছিল,সঙ্গে ছবি আঁকার।আমরা জানি বৌদ্ধদের সহজযান বলে একটি দল বাংলায় আজীবন থেকে গেছে।আর সহজযানের একটি অংশ হল বৈষ্ণব।আর যারা বাংলায় সরা আঁকেন।অন্তত পশ্চিমবঙ্গের সবাই বৈষ্ণব ধর্মের অন্তর্গত।কাজেই তাদের মধ‍্য দিয়ে সেই অনুষঙ্গ বাংলার সরাচিত্রে এসেছে।আমরা যদি পাল ও জৈন পুঁথিচিত্রের প্রতিতুলনা করি তাহলেই দেখা যাবে বসার ভঙ্গি ও রেখার সাদৃশ‍্যতা দেখতে পাব।আসলে সরার ঐতিহাসিক ভিত্তি বহু প্রাচীন এ প্রতিতুলনা করে জানা যায়।তালপাতার পুঁথির এই টুকু আঁকার মধ‍্যে যে ডিটেলিং ছিল তার প্রভাব স্বভাবত সরায় দেখা যায়।যেখানে ছোট জায়াগাটির ফিগার গুলি যেন সেই ইঙ্গিতই বহন করে।

একটা প্রশ্ন মাথায় বার বার ঘুরছিল,যে নীচে  লক্ষ্মী আঁকা হয় কেন? সরাশিল্পী সুকুমার পালকে জিজ্ঞেস করার ওনি বলেছিলেন-লক্ষ্মীর একটা গল্প আছে বুঝলা!এই যে ঘরে ঘরে লক্ষ্মী পূজা হয়।তোমার ঘরে আমার ঘরে।মুচি, হাড়ি, ডোমের ঘরে।তার মানে লক্ষ্মী ঘরের মেয়ে হয়ে উঠলেন। সবার কাছের।এই যে,সরায়(সরার দিকে তাকিয়ে) দুইটা ভাগ হয়।উপরে স্বর্গে,নীচে মানে মর্ত।তা লক্ষ্মী নীচে কেন?কারন লক্ষ্মী আমাদের ঘরের মেয়ে।ওনি সবার ঘরে যান পুজো নিতে।এই ধরুন দুর্গা,কালী,সবার ঘরে কি পুজো হয়!কিন্তু লক্ষ্ণীর হয়।তার মানে কি হইল লক্ষ্ণী সবার দেবী ও আরাধ‍্যা।এই যে সবার কাছে যেতে পারেন বলেই তিনি নীচে অবস্থান করেন।সে যেমন মায়ের সাথে উপরেও থাকেন আবার  সন্তানদের জন‍্যে নীচেও থাকেন,বুঝলা।আরকেটা কথা হইল গিয়া,নীচে আঁকা হয় কারন মানুষের অত পয়সা কোথায় যে বারবার সরা কিনবে।একটাতেই  দুর্গা আবার পরে লক্ষ্মী এটাতেই  লক্ষ্মী পূজা করবে।”অদ্ভুত এত বড় কথাটি কি সহজেই বলে ফেললেন।এ প্রসঙ্গে
বরিশালবাসী অনাথ বন্ধু কাব‍্য-ব‍্যাকারণতীর্থ তার বইতে সুরেশ্বরী  লক্ষ্মীর উল্লেখ করছেন এভাবে।যথা-
“পদ্মপলাশাক্ষি নামে সদা দাও জয়
মহালক্ষ্মী নামে কর সর্বব‍্যাধি ক্ষয়।।
সুরেশ্বরী নামে নতি করি ভক্তিভরে
হরিপ্রিয়া নাম সদা স্মরি ভক্তিভরে।।”

দেবী লক্ষ্মীর শতনামের মধ‍্যে রয়েছে সুরেশ্বরী নামটি।সুরেশ্বরী নামে লক্ষ্মীর একটি রূপের অস্তিত্ব ছিল।যেমনভাবে বাংলাদেশের সুরেশ্বরী জেলায় রয়েছে সুরেশ্বরী গান,কাব‍্য ও সুরেশ্বর বলে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়।কাজেই দিনের শেষে যখন নিজের কৌতূহল উত্তর পাওয়া যায়।তখন মাঠ গবেষনায় এক অন‍্যরকম আনন্দ হয়।অনেক কিছু যেন ঝুলিতে উঠে আসে।যেমন ভাবে সরার নীচে অংশে পেলাম সুরেশ্বরী লক্ষ্মীকে  ও তার পূর্ববর্তী ইতিহাসকে।

তথ‍্যঋণ :

বই
১.বাংলার লোকউৎসব ও মেলা-হীরেন্দ্রনাথ -বঙ্গীয় সাহিত‍্য পরিষদ,কলকাতা,পৌষ ১৪১৪

২.শ্রী শ্রী   লক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা-অনাথবন্ধু কাব‍্য-ব‍্যাকারণতীর্থ,অক্ষয় লাইব্রেরী,কলকাতা,ভাদ্র ১৪২২
৩.প্রবন্ধে উল্লেখিত সুরেশ্বরী সরাটি লেখকের সংগৃহীত।

পত্রিকা
১.কৌশিকী-সম্পাদক-তারাপদ সাঁতরা,বার্ষিকপত্র,১৯৯৮
২.নন্দন ―সম্পাদক : সৌমিক নন্দী মজুমদার , শিল্প ইতিহাস বিভাগ, কলাভবন, শান্তিনিকেতন, Volume XXVII2007

কৃতজ্ঞতা স্বীকার
১.সুকুমার পাল,তাহেরপুর নদীয়া।
২.রতন পাল ও তাঁর স্ত্রী চায়না পাল-তাহেরপুর, নদীয়া।
৩.সুনীল পালের ছবি সৌজন‍্যে-আনন্দবাজার পত্রিকা।

 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 51
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    51
    Shares

Facebook Comments

Post Author: দীপঙ্কর পাড়ুই

দীপঙ্কর পাড়ুই
দীপঙ্কর পাড়ুই--বর্ধমান বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতক।কলকাতা বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতকোত্তর।লোকশিল্প নিয়ে গ্ৰাম ঘোরাঘুরিও লিখতে ভালোবাসি।আচমন,রাঢ়কথা ইত‍্যাদি পত্রিকায় ও বঙ্গদর্শন ও দুনিয়াদারি পোর্টালে কতগুলি লোকশিল্পের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।