সূত্রধর বা ছুতোর জন-জাতির উদ্ভব ও পেশার কথা ইতিহাসের প্রেক্ষিতে

Share your experience
  • 595
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    595
    Shares

সূত্রধরদের সৃষ্টি হাতির দাঁতের ভাস্কর্য নশিপুর রাজবাড়ী মিউজিয়াম এ রাখা আছেহাতির দাঁতের ভাস্কর্য।।
সূত্রধরদের সৃষ্টি হাতির দাঁতের ভাস্কর্য ।নশিপুর রাজবাড়ী মিউজিয়াম

 

আশুতোষ মিস্ত্রী-–  সূত্রধর   এক প্রাচীন জনজাতি। সূত্রধর শব্দটির অর্থ হলো যিনি সুতো ধরে মাপজোখ করে কোন বস্তু নির্মাণ করেন।প্রাচীনকালে  ছুতোর সুতো ধরে  মাপ নির্ণয় করে কাঠের রথ বানাতেন।পরবর্তীকালে নানা শিল্পের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন তক্ষণশিল্পীরা ।যেমন এদেরকে বলা হয় কাঠের মিস্ত্রি।তেমনি ঘরের চাল তৈরি করেন বলে সূত্রধরদের নাম ঘরামি বা বাড়ই।  পেশাদারি জীবিকা থেকেই পরবর্তীকালে তারা এক বিশিষ্ট জনজাতিতে পরিণত হয়।সেই ইতিহাসের দু চার কথাই আলোচ্য নিবন্ধের মূল বিষয়বস্তু।

ইদানিং লকডাউনের জন্য পুরোনো মহাভারত সিরিয়াল আবার প্রদর্শিত হচ্ছিল টিভি চ্যানেলে। এই মহাভারতের গল্প কথায় কর্ণের মত চরিত্র কার না ভালো লাগে! এই কর্ণকে সূতপুত্র বার বার বলা হয়। তার পালিত পিতা অধিরথ। মহারাজা ধৃতরাষ্ট্রের সারথি ছিলেন। তিনি নিজে সূত ছিলেন। তাই রথ বানানো ও চালনার কাজ করতেন। এই সূত সম্প্রদায়ই হলেন বর্তমান যুগের সূত্রধর জাতি গোষ্ঠী।সুতরাং বোঝাই যায় যে সূত্রধরেরা পূর্বে কাঠের রথ বানাতেন এবং চালনা করতেন।

সূত্রধর নামকরণ

করাত চালানোর সময় কাঠ চেরাই করতে সুতোর মাপ জোখের দরকার হয়। সেই সূত্র শব্দ থেকেই “সূত্রধর” কথাটি এসেছে। আবার সূত্রধর সম্পর্কে সংজ্ঞায় দেখা যায়- ” যারা সূত্র দ্বারা যজ্ঞ বেদি ও অট্টালিকা সূচনা করতেন , ফলকাদির উপরে প্রাসাদের লক্ষণ বা মানচিত্র অঙ্কন করতেন তারা সূত্রধর পদবাচ্য হতেন”। ফলত সূত্রধর মানেই মাপজোপ মেনে যিনি কাঠের কাজ বা ভাস্কর্যের কাজ করতেন।

বিশ্বকর্মার বংশধর

সূত্রধর সম্প্রদায়গণ দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার বংশধর বলে দাবি করে থাকেন। বিভিন্ন পুরাণ , উপপুরাণে তার উল্লেখ আছে। যেমন “স্কন্দপুরাণে” লেখা আছে –

” দারুকার : স্বর্ণকার : শিলাকারস্তথৈবচ:।
অয়ঙ্কার : তাম্রকার : পঞ্চৈতে রথকারক:।।
বিশ্বকর্মা সূতাহ্যেত রথকারস্ত পঞ্চচ।।”
অর্থাৎ বিশ্বকর্মার মুখোদ্ভূত পঞ্চ সন্তানের( মনু, ময়, ত্বষ্টা, শিল্পী ও দৈবজ্ঞ) বংশধরগণ যথা – লৌহকার, কাষ্ঠকার, তাম্রকার,শিলাকার ও সুবর্ণকার , এই পঞ্চশ্রেণী রথকার পদবাচ্য।এখান থেকে স্পস্ট বোঝা যায় যে সূত্রধর শুধু রথ নির্মাণ করতেন না,প্রকৃতপক্ষে তাঁরা শিল্পী ছিলেন যথা দারু ভাস্কর,শিলা ভাস্কর এমনকি ধাতু ভাস্করও ছিলেন।

সূত্রধরদের কাজ।ময়ূর পঙ্খী বজরা ।হাতির দাঁতের ভাস্কর মুর্শিদাবাদের নশিপুর রাজবাড়িতে সংগৃহীত
সূত্রধর কাজ। ময়ূর পঙ্খী বজরা ।হাতির দাঁতের ভাস্কর মুর্শিদাবাদের নশিপুর রাজবাড়িতে সংগৃহীত

সূত্রধর পুরাণে

“ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ” মতে ব্রাহ্মণবেশী বিশ্বকর্মার ঔরসে গোপকন্যাবেশী ঘৃতাচীর গর্ভে ৯ পুত্রের জন্ম হয়। তারা হলেন – মালাকার , কর্মকার , শঙ্খকার, তাঁতি , কুম্ভকার, কাংস্যকার, সূত্রধর, চিত্রকার ও স্বর্ণকার সম্প্রদায়ের আদিপুরুষ। এদের মধ্যে সূত্রধর জাতি পূর্বে রথকার রূপেই গণ্য ছিলেন। যা আমরা স্কন্দ পুরাণেও পেয়েছি। ব্রাহ্মণদের মত এই সূত্রধর সম্প্রদায়ের গলায় পৈতে থাকতো সেইসময় বলে জানা যায়। এছাড়া তক্ষ ও বণকি নামেও এই সম্প্রদায় অভিহিত ছিলেন। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে এই সম্প্রদায় অভিহিত হয়ে আসছে।

যেমন পশ্চিমবঙ্গে – সূত্রধর , ভাস্কর , মিস্ত্রী, শর্মা , কর টাইটেলের লোকজনদের বোঝায়। উত্তর পশ্চিম ও মধ্যপ্রদেশে এদের “বড়হই” জাতি বলা হয়। মাদ্রাজে বলা হয় তকচন। মুম্বাইে তাদের “সূতার ও বড়িগ” বলা হয়। রাজস্থানে এদের আবার “ক্ষতি” বলা হয়ে থাকে। পাঞ্জাবে এ জাতিকে বলে “তরখানা” এবং উড়িশায় বলা হয় “মহারাণা” জাতি।

 সূত্রধরদের কাজ নবাবদের হস্তী পৃষ্ঠে আরোহণ হাতির দাঁতের কাজ।
সূত্রধরদের কাজ নবাবদের হস্তী পৃষ্ঠে আরোহণ হাতির দাঁতের ভাস্কর্য

সূত্রধরদের পেশা

সূত্রধর মূল পেশায় হল কাষ্ঠ শিল্প। পূর্বে স্থাপত্য শিল্প , দেবতাদের দারু মূর্তি বানাতেন। পাথরের মূর্তি , পুতুলের মূর্তি, দেব মন্দির , রথ , বাদ্যযন্ত্র প্রভৃতি তৈরি করার কাজ ও করতেন। এছাড়া কাঠের ও হাতির দাঁতের আসবাবপত্র , গৃহ নির্মাণ ও দরজা জানালা বানানো এদের প্রধান জীবিকা ছিল। এছাড়া অন্যান্য জাতির বৃত্তিকেও এরা জীবিকা অর্জনের জন্য গ্রহণ করতেন।

যেমন , রাঢ়ীয় সুত্রধরদের বৃত্তি প্রসঙ্গে মুকুন্দরাম চন্ডীমঙ্গলে উল্লেখ করেছেন –

‘ ছুতার নগর মাঝে      চিঁড়া কুটে মুড়ি ভাজে
কেহ করে চিত্র নির্মাণে ‘।

ষোড়শ শতকে সূত্রধরদের একাংশ চিত্রকর বা পটুয়া ছিলেন।আর তাঁদের অন্যতম জীবিকা ছিল চিঁড়ে তৈরি করা ।এই কথা চণ্ডীমঙ্গল থেকেই জানা যায়।

 

সূত্রধরদের কাজ।চালশিল্পী
সূত্রধরদের কাজ।চালশিল্পী

ভাস্কর ও মৃৎশিল্পী  চালশিল্পী

এছাড়া অনেক ছুতোর মাটির প্রতিমা গড়ার কাজে ও যুক্ত আছেন। নবাবী আমলে এই ভাস্কর শিল্পীরা হাতির দাঁতের আসবাব পত্র বানাতেন। যা এখনও বিশ্ব বিখ্যাত শিল্পের তকমার স্থান পেয়েছে। এছাড়া মিস্ত্রী সম্প্রদায়ের লোকেরা মাটির বাড়ির দরজা জানালা তালকাঁড়ির কড়ি বরগার ছাদ বানান। টিন পিটিয়ে চালা যুক্ত তিনতলা বাড়ি বানানোর কাজ করেন। এছাড়া দরজা , জানালা , চৌকি ও নানান ধরনের আসবাব পত্র বানাতেন।

যদিও বর্তমানে এই মাটির বাড়ি তৈরি করা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবুও রাঢ় বঙ্গে এই মাটির বাড়ি এখনো বিশেষ দেখা যায়। বর্তমানে এই সূত্রধর জাতির কিছু লোকেরা বিভিন্ন অঞ্চলে ফার্নিচারের কারখানা খুলে স্বতন্ত্র ব্যবসা করে যাচ্ছেন। কয়েকজন শ্রমিক লাগিয়ে দরজা – প্যানেল , জানালা , আলমারি , বিভিন্ন ধরনের খাট তৈরি কাজ করে থাকেন অর্ডার অনুযায়ী।

সূত্রধরদের তৈরি খাটের একাংশ
সূতধরদের তৈরি খাটের একাংশ

আরো পড়ুন https://bengali.koulal.com/henry-martyns-pagoda-serampore/

ছবি–লেখক

 

তথ্য সূত্র :
পশ্চিমবঙ্গের মমি পুতুল শিল্প ও শিল্পী সমাজ(চতুর্থ অধ্যায়) – মুকুলেশ প্রামাণিক।


Share your experience
  • 595
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    595
    Shares

Facebook Comments

Post Author: Ashutosh Mistri

Ashutosh Mistri
আশুতোষ মিস্ত্রী ।বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলার নবগ্রাম থানার অন্তর্গত জারুলিয়া গ্রামে । বর্তমানে বহরমপুর Ghosh AET Centre ফার্মের অ্যাকাউন্ট দেখা শুনো করেন । Murshidabad Heritage And Cultural Development এর সদস্য ও ইতিহাস বিষয়ক বই সংগ্রাহক।ক্ষেত্রসমীক্ষক।