কার্তিকের ভোরে আজও শোনা যায় টহলের গান

Share your experience
  • 25
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    25
    Shares

রটন্তী ঘোষঃজনমানুষের প্রাণের প্রবাহ থেকেই সৃষ্টি হয়েছে–লোকায়ত সংস্কৃতির। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মাঝে, জনজাতির যে প্রচলিত রীতিনীতি গুলি রয়েছে তাকে বলা হয় Folklore বা ‘ লোকাচার বিদ্যা’। এই লোকচার বিদ্যাগুলি অঞ্চল বিশেষে পালিত হয়ে থাকে ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ ‘দ্বারা।বিশেষত: রাঢ় অঞ্চলের মানুষেরা ,চিরাচরিত লোকবিশ্বাস ও ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এই কার্তিক অগ্রহায়ন মাসদুটিতে নানা  ব্রতধর্ম পালন করে থাকেন।  গ্রাম্য লোকজীবনের একান্ত নিজস্ব প্রথা মেনেই এই সময় পূর্বপুরুষদের আত্মাকে আলো দেখানোর জন্য গৃহস্থ বাড়িতে উঠানের মাঝখানে টাঙানো হয় ‘আকাশপ্রদীপ’ বা ‘ফানুস আলো’। কখনো মেয়েরা পালন করে থাকে– ‘যমপুকুর’ , ‘পুণ্যি পুকুর’  বা ‘সাঁঝ পূজানীর ব্রত’। সমগ্র মাস জুড়ে  প্রতিদিন ভোর বেলায় গাওয়া হয় –‘প্রভাতী গান’ বা ‘টহল গান’।

এগুলি সবই গ্রাম্য জীবনের একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতি। এই লোকসংস্কৃতির মধ্যেই জড়িয়ে রয়েছে তাদের নিজস্বতা ,ভালোবাসা। রয়েছে তাদের  অন্তরের আনন্দের  সুর। যা থেকে জন্ম নিয়েছে বিভিন্ন ধরণের লোকগান। যার মধ্যে অন্যতম একটি উল্লেখ্য হলো এই ‘প্রভাতী গান’ স্থানীয় ভাষায়  যার নাম ‘টহল গান’।
রাঢ় বঙ্গের অন্তর্গত জেলাগুলির মধ্যে বীরভূম,বর্ধমান, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি জেলার বিভিন্ন গ্রামগুলিতে প্রচলন রয়েছে এই টহল গানের। টহল গায়কেরা  ভোর বেলায় হাতে থাকা খঞ্জনির দ্বারা  মিঠে আওয়াজ করে পদাবলী কীর্তনের অন্তর্গত ‘কুঞ্জভঙ্গের’ প্রথম পর্ব গুলি, বা চৈতন্যের বাল্যলীলার গান গুলি সুমধুর সুরে গাইতে গাইতে সমগ্র গ্রাম পরিভ্রমণ করেন। এই গান গাইবার জন্য এলাকা ভিত্তিক একজন করে ব্যক্তি নিৰ্দিষ্ট থাকেন। যাঁরা প্রতি বছর কার্তিক মাসের এই সকালে এই  টহল গান গাইবার কাজটি করে থাকেন।

এমনই একজন টহল গায়কের সাথে কথা বলে জেনেছি তাদের এই গান সম্পর্কে অনেক কথা।গায়কের নাম তারক দাস বৈরাগ্য , বাড়ি বর্ধমান জেলার কেতুগ্রামের বিরাহিমপুর গ্রাম।  টহল গায়ক হিসাবে তার সুখ্যাতি সর্বজনবিদিত ।  টহল গায়কদের গাওয়া প্রভাতীগানের সুরের মূর্ছনায় মন উদাসী হয়ে যায়  সুদূর কল্পলোকে। ভোরের নির্মলতা ও নির্জনতা ছাপিয়ে বহুদূর থেকে শোনা যায়   তারকদাসের কণ্ঠ থেকে বের হওয়া মিঠে গান—-

“নিশি হলো ভোর,ওরে মাখন চোর,
বলাই দাদা তোরে ডাকিছে।।
ওরে নীলমণি !উঠিয়া খাও রে ননী-,
দিনমনির উদয় হতেছে।”

অথবা বাঙালীর প্রাণের নিধি গৌরসুন্দরের উদ্দেশ্যে গাওয়া গান—-

“ওঠো ওঠো গোরাচাঁদ ! নিশি পোহাইল,
নদিয়ার লোক সব জাগিয়া উঠিল।
ময়ূর-ময়ূরী আর কোকিলের ধ্বনি ,
কত সুখে নিদ্রা যাও, গৌর গুণমনি!”

নিশির অবসানে , তন্দ্রা আবেশের মধ্যে এই মায়াবী সুরের ছোঁয়ায়  পল্লীবাসী জেগে ওঠে । গৃহবধূ  শ্যামলী ঘোষরা বলে– ওই নাম দিতে  এসেছে তারক দাস বাবাজী,আর রাত নেই। ছোট ছেলে -মেয়েরা বিছানা ছেড়ে উঠে এসে  আবদারের সুরে বলে –“ও টহল দাদু !আর একটা গান গাও না গো, শুনে ছেলে মেয়েদের আবদার মেটাতে ক্ষণিকের জন্য দাঁড়িয়ে পড়ে। আবার গাইতে থাকেন মধুর সুরে

“প্রভাত সময়ে শচীর আঙিনা মাঝে ,

গৌরচাঁদ নাচিয়া বেড়ায় রে,

জাগো নি গো শচীমাতা

,গৌর আইলো প্রেম দাতা,

ঘরে ঘরে হরির নাম বিলায় রে”

হাতে খঞ্জনি আর সঙ্গে থাকে টিম টিম করে জ্বলতে থাকা চিমনি আলো। তারক দাস বাবাজীর (টহল গায়কের )সাথে কথা বলে জানতে পারি উনি ওভাবেই প্রায় ৪০ বছর ধরে  পার্শ্ববর্তী গোয়ালপাড়া, বিরাহিমপুর, বালুটিয়া গ্রামে গেয়ে চলেছেন এই প্রভাতী গান। ওনার কাছেই জানতে পারি এই টহল গানের উদ্দেশ্য –এই কার্তিক মাসেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন চৈতন্য সহচর নিত্যানন্দ গোসাঁই । তাই বৈষ্ণব ভক্তজনের কাছে এই কার্তিক মাস একটি ধর্মনিষ্ঠ মাস ।স্থানীয় প্রথা অনুসারে  ওই অঞ্চলের বিরাহিমপুরে প্রতিষ্ঠিত রাধা গোবিন্দের মন্দিরের সামনে গিয়ে ভোর বেলাতে” রাই জাগো, রাই জাগো! বলে শুক-সারি ডাকে” –এই প্রভাতী গান গেয়ে  শয়ানে থাকা রাধা-গোবিন্দের নিদ্রাভঙ্গ করেন। যাকে কুঞ্জভঙ্গ-ও বলা হয়। এরপর পুরোহিত মঙ্গল আরতির দ্বারা বিগ্রহের সেবা কার্য সম্পাদন করেন ।এরপর টহল গায়ক বেরিয়ে পড়েন ‘নগর ভ্রমণে ‘ নাম গান শোনাতে ।

স্থানীয় পুরুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা বিষয়ের প্রাক্তন শিক্ষক কাশীনাথ ঘোষ মহাশয়ের কথায় ,এই টহল গানের আরেকটি বিশেষ উদ্দেশ্য হলো –

” মাসমধ্যে মার্গশীর্ষ আপনি ভগবান,

হাটে মাঠে গৃহগোঠে সবাকার ধান”                             –

অর্থাৎ ,পল্লী গ্রামের মানুষজনের কাছে শস্যপরিপূর্ণ অগ্ৰহায়ন মাসটি সমৃদ্ধশালী শ্রেষ্ঠ একটি মাস হিসাবে ধরা হয়। কৃষির   মুখ্য  শস্য হলো ‘ধান’ এবং গ্রামের মানুষদের কাছে  যেহেতু কুমার কার্তিক হলো ফসলের দেবতা -ঊর্বরতার প্রতীক। তাই সমৃদ্ধির সূচক এই অগ্ৰহায়ন মাসের আবাহনের জন্যই সারা কার্তিক মাস জুড়ে ভোর বেলায় এই টহল গান গাওয়া হয়।

যন্ত্রনির্ভর এই এক বিংশ শতকের ,ব্যস্ততম আধুনিক  জীবন যাত্রার মধ্যিখানেও কিন্তু বিন্দুমাত্র কদর ফুরায় নি এই প্রভাতী সংগীত বা টহল গানের ।আজও সমান ভাবে রাঢ় বঙ্গে সমাদৃত হয়ে রয়েছে  টহল গান এবং তার গায়কেরা । হেমন্তের মৃদু শীতের আবেশকে তোয়াক্কা না করেই টহল গায়কেরা তাদের মধুর  প্রভাতীসংগীতের দ্বারা  মুখরিত করে তোলেন পল্লী জনজীবন। প্রবাহমান সময়ের সাথে  সঙ্গতি  বজায় রেখে তাই আজও  বর্তমান প্রজন্মের কাছেও সমাদর লাভ করে চলছে লোকসংগীতের এই এক অন্যতম উজ্জ্বল অংশ–‘প্রভাতী সংগীত ‘ বা ‘টহল গান’।

ছবি-লেখক ও স্বপনকুমার ঠাকুর


Share your experience
  • 25
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    25
    Shares

Facebook Comments

Post Author: রটন্তী ঘোষ

রটন্তী ঘোষ
রটন্তী ঘোষ।পেশায়- শিক্ষিকা।লোকসংস্কৃতি অনুরাগী।