তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্প পাখা আজও গ্রাম গঞ্জে টিকে আছে

Share your experience
  • 621
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    621
    Shares

তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্প আজও গ্রামে গঞ্জে টিকে রয়েছে।তালঅপাতার পাখা থেকে শুরু করে টোকা পেকে তালাই ছাতা ইত্যাদি সহজিয়া লোকশিল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে আসছে।গ্রামবাংলার এই পরম আদরের লোকশিল্প নিয়ে লিখছেন–ডা.তিলক পুরকায়স্থ।

তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্প-পাখা
তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্প-পাখা

তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে

” আমার নাম তালের পাখা, শীতকালে দেয়না দেখা, গ্রীষ্মকালে প্রাণের সখা।”
আজ থেকে চল্লিশ/পঞ্চাশ বছর আগেও বাংলার গ্রামেগঞ্জে দেখা যেত প্রচুর তালগাছ। তালগাছ তখন বাঙালির মনে প্রাণে জুড়ে রয়েছে, কত গান, কত ছড়া, কত উপমা জড়িয়ে গেছে তালগাছ নিয়ে। খান মহম্মদ মঈনুদ্দিন লিখছেন-” ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গাঁ”, তো রবিঠাকুর লিখলেন সেই অমর ছড়া -” তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে”, শুধু তাই নয়, তালগাছের পাতা নিয়ে লিখলেন- তালগাছের মাথার গোল গোল পাতা যেন ডানা মেলে উড়ে যেতে চায়। রবিঠাকুরের মতন তালগাছ ভালোবেসে শান্তিনিকেতনে তালগাছ ঘিরে “তালধ্বজ” নামে একটা বাড়িই তৈরি করে ফেলেন তেজেশচন্দ্র সেন মহোদয়।

বাংলাসাহিত্যে তালগাছ

তালগাছ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কত উপমা- ” তিলকে তাল করা” , “তালপাতার সিপাই”, “তালপুকুর” , “তালকানা” , ” তালগোল পাকানো” । এমন কি জন্মাষ্টমীর পরের দিনটি তালনবমী নামে পরিচিত, সেদিন গ্রামে গঞ্জে পানের বুরুজের চাষিরা(বারুই) বিশেষ পুজো অর্চনা করেন।তালের পাতা বেশ শক্ত, এর মধ্যে দিয়ে জোরে হাওয়া বইলে এক ধরণের অদ্ভুত আওয়াজ বেরোয়, আর ছোটবেলায় দেখতাম তালগাছের পাতা থেকে প্রচুর বাবুই পাখির বাসা ঝুলত, আবার কখনও কখনও চিল বা শকুনেও বাসা করত। তালগাছ বেয়ে বিশাল সাপের ওঠানামাও চোখে পড়ত।তালপাতার সঙ্গে উড়ন্ত পাখির ডানার সাদৃশ্যের জন্য পাম গোত্রীয় এই গাছগুলোর ইংরেজি নাম ফ্যান-পাম।

তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে
তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে

তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্প

দেখে নেওয়া যাক তালপাতার বিভিন্ন ব্যবহার। গ্রামেগঞ্জে ঘর ছাওয়া থেকে ঘরের বেড়া নির্মাণ করা, হাতপাখা নির্মাণ, তালপাতার চাটাই তৈরি করা এসবের তো প্রচলন ছিল এবং এখনও আছে। তালপাতা দিয়ে আরো তৈরি করা হত তালপাতার বাঁশি, পুতুল, তালপাতার পুঁথি, পটচিত্র, জন্মকুণ্ডলী এরকম আরো কত কিছু। তালপাতা থেকে ছোট-বড় হাতপাখা আর তালপাতার কাণ্ড বা ডাগুর বা চটা কে জলে ভিজিয়ে , পচিয়ে এর ভিতর থেকে সরু , পাতলা, লম্বা আঁশ বা সুতো ছুলে তুলে নিয়ে সেই আঁশ শুকিয়ে, তালপাতার সঙ্গে বুনে তৈরি হত তালের টুপি বা টোকা, পেঁকে, সাজি, ঝুড়ি এসব কত কিছু।

 

তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্প-হাতপাখা

বহু প্রাচীন ঐতিহ্য এই তালপাতার পাখা নির্মাণ শিল্প। সাধারণ মানুষের নিত্য ব্যবহারের জন্য ছোট ছোট হাতপাখা আর ঠাকুর-দেবতা, রাজা-বাদশা, সাহেব-সুবা এবং বাবু ঐতিহ্যর ধারক বাবুদের জন্য তৈরি হতো ঢাউস আকারের সব পাখা। ঠাকুর-দেবতার মূর্তির দুধারে দুজন অপ্সরা ঢাউস দুটি গোলাকার নকশি পাখা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, এই দৃশ্য নিশ্চয়ই সবাই মনে করতে পারছেন । তবে সাদা চামড়ার সাহেব এবং তাঁদের খয়ের খাঁ নেটিভ বাবুদের ঘর গ্রীষ্মে ঠান্ডা রাখার জন্য এক বিশেষ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ করা হত। সাহেবদের কাছে এঁরা পরিচিত ছিলেন পাঙ্খা পুলার আর বাবুদের ঘরে পাঙ্খা বরদার নামে ।

বিশাল ঘরের কড়ি কাঠে আড়াআড়ি ভাবে লাগান থাকত এক বিশাল চৌকো তালপাতার পাখা। চতুর্দিকে কাপড় মুড়িয়ে দিয়ে এটিকে শক্ত-পোক্ত করে তৈরি করা হতো। টঙ্গি ঘরে কিম্বা ঘরের বাইরে বারান্দায় থাকত পাঙ্খা পুলার। পাখার সঙ্গে বাঁধা থাকত মোটা রশি, যার শেষপ্রান্ত থাকত পাঙ্খা পুলারের মুঠিতে। পাঙ্খা পুলারের রশি টানার সঙ্গে ঘরের মধ্যে পাখা ঘুরছে অর্ধবৃত্তাকারে , সাহেবের দেহমন ঠান্ডা হচ্ছে। রশি টানতে টানতে যদি পাঙ্খা পুলারের চোখ বুজে এসেছে তবে পিঠে জুটত সবুট লাথি। আমাদের বাবুরাও এব্যাপারে কিছুমাত্র পিছিয়ে ছিলেন না।

একটা কথা বলি, বাবু কালচারের যুগে সৎ চরিত্রের বাবুরা তো বেশিরভাগ রাত্রিবেলা গণিকা গৃহেই থাকতেন, তাই বাড়ির গিন্নিদের চরিত্র ঠিক রাখতে বাবুরা পাঙ্খা বরদার চাকরিতে সাধারণত দৃষ্টিহীন, শক্ত সমর্থ যুবক পছন্দ করতেন।ঢাউস নকশি পাখা ছেড়ে আসি বাংলার ঘরে ঘরে ব্যবর্হিত তালপাতার হাত পাখার কথায়। কাঠফাটা রোদে তেতে পুড়ে এসে, মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে স্নেহশীলা মা বা গৃহিণীর হাতে কাঁসার গ্লাসে বা ঘটিতে এক গ্লাস নির্মল, স্বচ্ছ, ঠান্ডা কুঁঁয়োর জলপান আর তালপাতার হাতপাখা দিয়ে হাওয়া খাওয়া, সে যে কি অসাধারণ একটি অনুভূতি আজকের ভোগবাদী সমাজ তা বুঝতেও পারবেনা।

তালপাতার বৈচিত্র্যময় লোকশিল্প–পাখা নির্মাণ

আসি তালপাতার পাখা নির্মাণ প্রসঙ্গে।এটি ছিল বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কুটিরশিল্প। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার বহু জায়গা পাখার গ্রাম নামে পরিচিত ছিল, যেমন তমলুকের পাখাগ্রাম বা পূর্ব মেদিনীপুরের এক গণ্ডগ্রাম পাখুরা।তালগাছের ডাগুর সহ তালপাতা কেটে আনতে আমাদের ছেলেবেলায় , গ্রামের ডোম বা নমঃশূদ্র পাড়ার গাছে চড়ার ওস্তাদ লোকেদের ডাক পড়ত। পাতা কাটা হত তাল এবং রস হওয়ার আগে । তালের রস কিন্তু শীতকালে নয় মেলে গ্রীষ্ম ও বর্ষার মাঝামাঝি অবধি। দুই পায়ে বাঁধা একটা আড়াআড়ি রশির সাহায্যে তরতর করে গাছে উঠে যেত ওরা, কোমরের গোজা থাকত একটা হেঁসো, তাই এঁদের হাঁসুরে বলা হত।

পাতা সংগ্রহ

তবে অনেককে দেখতাম চিল আর সাপের ভয়ে একটা লম্বা মুলিবাঁশ নিয়ে গাছে চরত , এটার ডগায় আবার একটা ধারাল কাস্তে জোড়া থাকত , ওদের ভাষায় এই যন্ত্রটির নাম পাতকাটা। সেই পাতকাটা যন্ত্র দিয়ে একরাশ ডাগুর সহ তালপাতা কেটে এনে উঠানে ডাঁই করে রাখা হত। (তালগাছের কিন্তু ছেলে আর মেয়ে গাছ আলাদা। গ্রীষ্ম ও বর্ষার মাঝামাঝি অবধি ছেলে গাছের পাতা কাটার পরে বিশেষ পদ্ধতিতে আগা ঝোড়া, চা়ঁছা ছোলা এবং নলি মেরে তাল গাছের আগা কেটে ঝুলিয়ে দিত রস সংগ্রহের হাঁড়ি বা পাতিল- সে এক অন্য রসের গল্প।)

হাট বাজারে

তালপাতা হাটবারে চলে যেত বিভিন্ন স্থানেরহাটে। এখন আর বাংলাদেশে নয়, ভালো তালপাতা আসে বিহার, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা এবং অন্ধ্র প্রদেশ থেকে।সেই তালপাতা ৭ থেকে ১০ দিন জলে ডুবিয়ে রেখে পচিয়ে , তারপরে রোদে শুকিয়ে বা জাঁক দিয়ে পাতাগুলি সোজা করা হয়। তারপরে পাতাগুলি থেকে ধারাল ছুরির সাহায্যে পাখা তৈরির সাইজ করে কাটা হয়। এরপরে খুব সরু বাঁশের কঞ্চির ফ্রেমে তালের পাতা মেলে দিয়ে বাঁধন দেওয়া এবং রঙ তুলিতে ডিজাইন করে তৈরি হত তালপাতার হাতপাখা। অনেক পাখার দন্ডকে সরু করে ছুলে একটি সরু বাঁশের চোঙের মধ্যে ঢোকান হয়। এতে পাখাটি ঘোরাতে হয়ত সুবিধা হয়। একজন ব্যক্তি দিনে ২৫-৩০ টি পাখা তৈরি করতে পারেন। ১০০ টি পাতা থেকে গড়ে ২০০ টি পাখা তৈরি হয়।

তালপাতার পাখা
তালপাতার পাখা

পাখার শিল্প

আবার কিছু কিছু দামি হাতপাখা যেমন নকশাদার পাটি পাখা, সুতোয় বোনা পাখা, কাপড়ের নকশা পাখা ইত্যাদি কিন্তু শিল্পী বাড়ির মেয়েরাই ধৈর্য ধরে তৈরি করত।একমাত্র তালপাতার পাখাতেই পরিবেশ ঠান্ডা হয়, অথচ ট্রামে, বাসে, ট্রেনে, বিয়ে বাড়ির মেনুকার্ডে সর্বত্র রঙিন প্রিন্ট করা কুৎসিত এবং পরিবেশের ক্ষতিকর সস্তার চৈনিক প্লাস্টিক , বা ভিনাইল বোর্ড কেটে তৈরি পাখা বিক্রি হচ্ছে। আমরাই এই সব ছাইপাঁশ জিনিষ কিনে পরিবেশবান্ধব তালপাতার হাতপাখা শিল্পের সর্বনাশ করে ছেড়েছি। আর মুখে লেকচার মারছি মেক ইন ইন্ডিয়া বলে।

আরও পড়ুন- খেলাইচণ্ডী লোকদেবীর পুজো হয় পশ্চিম বর্ধমানের কাল্লা গ্রামে

একটি সাধারণ হাতপাখা কিনে ঘরে নিয়ে আসার পরে সাধারণত বাড়ির মেয়েরাই সেই পাখার চারদিকের বর্ডারে শাড়ির পাড় বা লাল শালুর ঝালর লাগাতেন। কেউ কেউ সূঁঁচসুতো দিয়ে ঠাকুর দেবতার নাম বা দু-এক লাইন পদ্য লিখতেন। তারপরে কালের নিয়মে সেই পাখার ঝালর ছিঁড়ে গেলে নতুন পাখা কেনা হতো। পুরানো ভালোবাসার পাখার স্থান তখন রান্নাঘরে, কয়লার উনুন ধরানোর জন্য সেই মাজাভাঙা বৃদ্ধা পাখা দিয়েই সজোরে হাওয়া দেওয়া হত, যেন পাখা নয়, এক মানবীর জীবনচক্রের কথা।

ছবি- লেখক। 

তথ্যসূত্র: ১) হাতপাখা তৈরি : অস্তিত্বের সংগ্রাম। সৈকত শী। তবুও প্রয়াস, পঞ্চম বর্ষ, বিশেষ সংখ্যা, ২০১৭ ।

তালগাছ নিয়ে কৌলালের তথ্যচিত্র দেখুন-

 


Share your experience
  • 621
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    621
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।