তালপাতার ছাতা পেঁকে টোকা আবহমান লোকশিল্পের উদাহরণ

Share your experience
  • 792
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    792
    Shares

তালপাতার ছাতা পেঁকে টোকা আবহমান লোকশিল্পের উদাহরণ। আজও দেখা যায় গ্রামবাংলায়।যদিও এই সহজিয়া লোকশিল্পের ধারাটি বিলীয়মান।সস্তার পলিথিন এসে এই আবহমান লোকশিল্প বিলুপ্ত প্রায়।লিখছেন–ডা.তিলক পুরকায়স্থ।
তালপাতার ছাতা পেঁকে টোকা
তালপাতার ছাতা পেঁকে টোকা

তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে

আজ থেকে চল্লিশ/পঞ্চাশ বছর আগেও বাংলার গ্রামেগঞ্জে দেখা যেত প্রচুর তালগাছ। তালগাছ তখন বাঙালির মনে প্রাণে জুড়ে রয়েছে, কত গান, কত ছড়া, কত উপমা জড়িয়ে গেছে তালগাছ নিয়ে। খান মহম্মদ মঈনুদ্দিন লিখছেন-” ঐ দেখা যায় তালগাছ, ঐ আমাদের গাঁ”, তো রবিঠাকুর লিখলেন সেই অমর ছড়া -” তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে”, শুধু তাই নয়, তালগাছের পাতা নিয়ে লিখলেন- তালগাছের মাথার গোল গোল পাতা যেন ডানা মেলে উড়ে যেতে চায়। রবিঠাকুরের মতন  তালগাছ ভালোবেসে শান্তিনিকেতনে তালগাছ ঘিরে  “তালধ্বজ” নামে একটা বাড়িই তৈরি করে ফেলেন তেজেশচন্দ্র সেন মহোদয়।

বাংলা প্রবাদে তালগাছ

তালগাছ নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কত উপমা- ” তিলকে তাল করা” , “তালপাতার সিপাই”, “তালপুকুর” , “তালকানা” , ” তালগোল পাকানো” । এমন কি জন্মাষ্টমীর পরের দিনটি তালনবমী নামে পরিচিত, সেদিন গ্রামে গঞ্জে পানের বুরুজের চাষিরা(বারুই) বিশেষ পুজো অর্চনা করেন।তালের পাতা বেশ শক্ত, এর মধ্যে দিয়ে জোরে হাওয়া বইলে এক ধরণের অদ্ভুত আওয়াজ বেরোয়, আর ছোটবেলায় দেখতাম তালগাছের পাতা থেকে প্রচুর বাবুই পাখির বাসা ঝুলত, আবার কখনও কখনও চিল বা শকুনেও বাসা করত। তালগাছ বেয়ে বিশাল সাপের ওঠানামাও চোখে পড়ত।তালপাতার সঙ্গে উড়ন্ত পাখির ডানার সাদৃশ্যের জন্য পাম গোত্রীয় এই গাছগুলোর ইংরেজি নাম ফ্যান-পাম।

তালপাতার ব্যবহার

দেখে নেওয়া যাক তালপাতার বিভিন্ন ব্যবহার। গ্রামেগঞ্জে ঘর ছাওয়া থেকে ঘরের বেড়া নির্মাণ করা, হাতপাখা নির্মাণ, তালপাতার চাটাই তৈরি করা এসবের তো প্রচলন ছিল এবং এখনও আছে। তালপাতা দিয়ে আরো তৈরি করা হত তালপাতার বাঁশি, পুতুল, তালপাতার পুঁথি, পটচিত্র, জন্মকুণ্ডলী এরকম আরো কত কিছু। তালপাতা থেকে ছোট-বড় হাতপাখা আর তালপাতার কাণ্ড বা ডাগুর বা চটা কে জলে ভিজিয়ে , পচিয়ে এর ভিতর থেকে সরু , পাতলা, লম্বা আঁশ বা সুতো ছুলে তুলে নিয়ে সেই আঁশ শুকিয়ে, তালপাতার সঙ্গে বুনে তৈরি হত তালের টুপি বা টোকা, পেঁকে, সাজি, ঝুড়ি এসব কত কিছু।

তালপাতার ছাতা পেঁকে টোকা

এক ঝমঝম বৃষ্টির দিনে একটি কিশোর তার ঘরের জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে পিছনের চাষের জমিতে। দিন সাতেক ধরেই বৃষ্টিটা পরছে জমিয়ে। এখনকার দিনে যতই গান গাওয়া হোক- আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, সেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি কিন্তু উধাও। টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ, টালির ছাদে পড়া বৃষ্টি এমন কি চাল ধুয়ে মাটিতে পড়া বৃষ্টির আওয়াজ সব শব্দের একটি নিজস্ব সুর, তাল ছিল। খড়ের চালের মধ্য দিয়ে বালতি বা বাটিতে পড়া টুপ টুপ বৃষ্টির শব্দ অবধি কত মধুর মনে হত।
পেঁকে
পেঁকে

তালপাতার ছাতা পেঁকে টোকার ব্যবহার

ধোঁয়া ওঠা বৃষ্টি ভরা মাঠে কয়েকটা ফুটকির মতন মানুষ ধানের চারা রুইছে। পুরানো স্মৃতিরা জেগে উঠছে, অতীতের আকাশ ভাঙ্গা জল আজ নদী হয়ে নেমে আসছে দুচোখ বেয়ে। পরান কাকার পুরো পরিবার রয়েছে মাঠে, আচ্ছা ওদের যদি জলে ভিজে ঠান্ডা লেগে যায়, কি হবে ? কাকার তো আবার হাঁপানির টান আছে। ভাবতে ভাবতে সামনে হাজির হল কাকা, কাকী, দুলু, ভুলু দুই ভাই। মা হাজির গরম চা আর বিস্কুট নিয়ে। কাকা, কাকীর মাথায় রয়েছে কুলোর মতন দেখতে, তালপাতার এক বিশাল বর্ষাতি, মাথা থেকে পিছনে হাঁটুর নীচে অবধি ঢাকা- আমরা বলতাম পেঁকে, কোথাও বলত পেখে , মনে হয় মাথার দিকের সরু অংশ নিচে নেমে ডানা মেলা পাখনার মতন চওড়া হয়ে যেত বলে এমন নাম। আর দুই ভাইয়ের মাথায় রয়েছে দড়ি দিয়ে বাঁধা টোকা, ওরা মাঠে দাঁড়িয়ে বাবা-মাকে সাহায্য করছিল।
কাকার কাছে শেখা গেল যে, পেঁকে এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন ডান্ডা ছাড়া ছাতা বা বর্ষাতি। খালি যেদিক থেকে বৃষ্টির ছাট আসছে, সেদিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে মাঠে কাজ করতে হয়।আবার গরমকালে পেঁকে রোদ থেকে তো বাঁচায় বটেই এমনকি ভর দুপুরে মাঠের কাজ সেরে, মাটিতে পেঁকে পেতে গাছতলায় একটু ছোট্ট দিবানিদ্রাও দেওয়া যায়। কত পুরানো স্মৃতিরা ভিড় করছে বৃষ্টির হাত ধরে। পেঁকে আর টোকা, গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া এই দুটি তালপাতার কুটির শিল্পের ‌নমুনা কিন্তু পরানকাকা নিজের হাতে তৈরি করতেন। পরান কাকার আদি বাড়ি ছিল নদীয়া জেলায়, রানাঘাটের কাছে, ওঁর দুই ছেলে টোকা কে বলত মাথালি, মাথায় পরা হয় বলে বোধহয়। আজ এমন কোন গুণী ব্যক্তিকে জানিনা, যিনি এই ব্যবহারিক লোক সামগ্রী দুটি নিজ হস্তে তৈরি করতে পারেন।

তালপাতার ছাতা

তালপাতার ছাতা কবে তৈরি হয়েছিল, কে প্রথম তৈরি করেছিল, ইতিহাসে লেখা নেই। হয়ত নিওলিথিক যুগে মানুষ যখন গোষ্ঠীবধ্য জীবন যাপন শুরু করে প্রকৃতিকে বশ করার চেষ্টা করছে, তখন ঝড়, জল, বৃষ্টির প্রকোপ থেকে বাঁচতেই কি এই তালপাতার ছাতার নির্মাণ হয়েছিল। বহু প্রাচীনকালেই বাঁশের ডান্ডা যুক্ত ছাতার ব্যবহার দেখা যায়, মন্দিরে দেব-বিগ্রহ বহনে, রাজ মস্তকে এমন কি বৌদ্ধ মন্দিরের অন্দরে এবং ধর্মীয় শোভাযাত্রায়। এখনও বেনারসের গঙ্গার ঘাটে এধরনের হাজার হাজার তালপাতার ছাতা দেখা যায়।
আর দণ্ডহীন ছাতার ব্যবহার দেখতে পাই, হাজার হাজার মাইল পদব্রজে চীন থেকে ভারতে আসা শ্রমনদের মস্তকাভরণ হিসাবে, যেমনটি দেখা যায় হিউয়েন সাঙ্গের প্রচলিত ছবিতে। উনার মাথা এবং পৃষ্ঠদেশ ঢাকা সামগ্রিটি কি পেঁকোর প্রাচীন চৈনিক সংস্করণ ?
তবে চৈনিক সংস্করণটি কিন্তু অসাধারণ দেখতে এবং ব্যবহারিক প্রয়োগের অনন্য নমুনা । মাথাকে ঘিরে না রেখে, উপরে ফনার মতন বিস্তৃত অংশটি যেমন রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে পারত তেমনি  প্রয়োজনে বই খাতা এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী এর উপরে রাখা যেত।পেঁকো এবং টোকাও , দণ্ডহীন ছাতার উদাহরণ।
নাগরিক জীবন
নাগরিক জীবন

পেঁকে তৈরি

পেঁকে তৈরি করতে তালপাতা কেটে , পাট পচানোর মতন দু-সপ্তাহ পাতাগুলিকে খাল-বিল-পুকুরের জলে ডুবিয়ে রেখে পচানো হত । তারপরে জল থেকে তুলে পরিষ্কার করে শুকনো করা হত । শুকিয়ে গেলে পাতার শিরগুলি ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। এই শিরগুলি দিয়ে উঠোন ঝাড় দেবার শলার ঝাড়ু তৈরি হয়। শির আলাদা হয়ে গেলে পাতাগুলি ঝালরের মতন ঝুলতে থাকে, আগার দিক একটু ছেঁটে দিয়ে পাতাগুলিকে এক সাইজ মাপে কাটা হয়। তারপরে তালপাতার ডাগুর বা চটার সুতো (বা প্রয়োজনে চটের সুতো ), বাঁশের বা লোহার সূঁচে পরিয়ে দুটি পাতাকে সামান্য পরিমানে একটার উপরে আরেকটা চাপিয়ে চটার সুতো দিয়ে সেলাই করা হয়।
তারপরে মুড়ি বা মাথার দিকে একটি বাঁশের হ্যান্ডেল বা ফলার সঙ্গে তালপাতার ঝালরের একটি অংশ এমনভাবে মুড়িয়ে দিয়ে সেলাই করা হয় যে, জিনিষটি দেখতে হয় অনেকটা কুলোর মতন। বাচ্চাদের পেঁকো সাধারণত ৩০ পাতার বুননে তৈরি হয়, বড়দের জন্য লাগে এর দেড়গুন পাতা। পেঁকোর দৈর্ঘ্য হয় ব্যবহারকারীর মাথা থেকে হাঁটুর সামান্য নীচে অবধি। শেষপ্রান্তে এবং মধ্যে মধ্যে আড়াআড়ি বাঁশের পাতলা কঞ্চি লাগিয়ে কঞ্চির সঙ্গে তালপাতাগুলিকে সেলাই করে দিয়ে পেঁকোকে শক্তপোক্ত করে তৈরি করা হয়।

টোকা- ব্যবহার

টোকার ব্যাপক ব্যবহার এখনও প্রচলিত আছে গ্রামীন ভারতে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার কৃষক এবং শ্রমজীবী সমাজের মানুষদের মধ্যে। টোকা তৈরিতেও তালপাতার সঙ্গে বাঁশের পাতলা ছিলা ব্যবহার করা হয়। একটি বাঁশের গোল ফ্রেমের সঙ্গে বাঁশের ছিলার বুনন করে , অর্ধ বৃত্তাকারে টোকার প্রাথমিক স্ট্রাকচার তৈরি করা হয়। তারপরে তালপাতা দিয়ে বুনন করে চটার সুতো দিয়ে সেলাই করা। টোকা যাতে হাওয়ায় উড়ে না যায় তাই তাই দড়ি দিয়ে চোয়ালের নিচে বাঁধার ব্যবস্থা থাকে।
টোকার ব্র্যান্ড এম্বেসেডর বলতে চোখে ভাসে শিল্পসাধনায় নিমগ্ন টোকা মাথায় শিল্পী রামকিঙ্কর বেজ মহোদয়কে ।
ছবি- লেখক। বেনারসের ঘাটের ছাতা, টোকার ছবি লেখকের তোলা। পেকে কোথাও পাওয়া যায়নি বলে, ছবিটি তপনকুমার দাসের লেখা থেকে নেওয়া।
তথ্যসূত্র:
১) পেকে ও টোকা: ব্যবহারিক লোকশিল্প, তপনকুমার দাস। কৌশিকি, চতুর্থ বার্ষিক সংখ্যা। ১৯৯৮।
দেখুন কৌলালের অডিও ভিসুয়াল গল্প

 


Share your experience
  • 792
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    792
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।