পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে জগদ্ধাত্রী

Share your experience
  • 46
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    46
    Shares

আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়ঃজগদ্ধাত্রী দুর্গার সত্ত্বগুণী রূপ (মহিষাসুরমর্দিনী রজঃগুণী এবং কালী তমোগুণী রূপ)। ভারতের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সর্বত্র এবং ওড়িশার অনেক জায়গায় জগদ্ধাত্রী পূজা করার রেওয়াজ আছে। বলা হয় যে পশ্চিমবঙ্গে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় (জন্ম ১৭১০ খৃষ্টাব্দ, মৃত্যু ১৭৮৩ খৃষ্টাব্দ) “দ্বিতীয় দুর্গাপূজা” হিসাবে। কৃষ্ণচন্দ্রের রাজধানী কৃষ্ণনগর তথা নদীয়া থেকেই পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জায়গায় জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন হয় বলে বিশ্বাস। বর্তমানে কলকাতা সহ প্রায় সমগ্র পশ্চিমবঙ্গেই জগদ্ধাত্রী পূজা হলেও চন্দননগর-ভদ্রেশ্বর ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলের জগদ্ধাত্রী পূজাই জাঁকজমকের দিক থেকে সবচেয়ে জমকালো ও বিখ্যাত। চন্দননগরের আলো-শিল্পীদের আলোকসজ্জার কাজ বিশ্ববিখ্যাত এবং চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পূজার বিসর্জনের মিছিলের বর্ণাঢ্যতা ও জাঁকজমককে ব্রাজিলের রিও-ডি-জেনেইরোর বিশ্ববিখ্যাত কার্নিভ্যালের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

বর্তমান নিবন্ধে আমরা জগদ্ধাত্রী বা জগদ্ধাত্রী পূজা সম্বন্ধে আলোচনা না করে জগদ্ধাত্রীর সম্পূর্ণ অন্য একটি দিক নিয়ে আলোচনা করবো, তা হল পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে জগদ্ধাত্রী। বলাই বাহুল্য, এই আলোচনায় আমরা শুধুমাত্র লেখকের দেখা এবং ফটোগ্রাফি করা মন্দিরে জগদ্ধাত্রীর উপস্থিতি নিয়েই আলোচনা করবো, এছাড়া আরও নানা মন্দিরে জগদ্ধাত্রী নানারূপে থাকতে পারেন যা এই আলোচনার গণ্ডির বাইরে।

জগদ্ধাত্রীর রূপ

শাস্ত্রানুসারে জগদ্ধাত্রীর গাত্রবর্ণ সকালের সূর্যালোকের মত স্নিগ্ধ লালের আভাযুক্ত সাদা। দেবী ত্রিনয়নী, চতুর্ভূজা। তাঁর চার হাতে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও তির। তাঁর গলায় থাকে নাগযজ্ঞোপবিত যা যোগশক্তি ও ব্রহ্মশক্তির প্রতীক। দেবী সিংহবাহিনী, এবং সিংহের পদতলে হস্তিরূপী করিন্দাসুর। এই হাতিকে মানুষের মনের অহংভাব বা ইগো-কে বোঝায়। ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ এই হাতিকে মানুষের উন্মত্তের ন্যায় চঞ্চল মনোবৃত্তির প্রতীক বলেছেন।

প্রসঙ্গতঃ, শ্রীশ্রীমা সারদা দেবীকে জগদ্ধাত্রীর লৌকিক রূপ বলে মনে করা হয় এবং তিনিই রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে জগদ্ধাত্রী পূজার প্রচলন করেন।

পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে জগদ্ধাত্রী

আগেই বলা হয়েছে, এই আলোচনায় আমরা শুধুমাত্র লেখকের দেখা এবং ফটোগ্রাফি করা মন্দিরে জগদ্ধাত্রীর উপস্থিতি নিয়েই আলোচনা করবো, এছাড়া আরও নানা মন্দিরে জগদ্ধাত্রী নানারূপে থাকতে পারেন যা এই আলোচনার গণ্ডির বাইরে।

ক) উপস্থিতি : পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার প্রচুর উদাহরণ থাকলেও “দ্বিতীয় দুর্গা”জগদ্ধাত্রীর উপস্থিতি বিরল না হলেও খুবই কম বলা যায়। বর্তমান লেখকের অভিজ্ঞতায় কয়েকশো মন্দিরের টেরাকোটা, স্টাকো বা পাথরের অলঙ্করণে জগদ্ধাত্রীর উপস্থিতি হাতে গোনা মাত্র।

যে কয়টি মন্দিরের অলঙ্করণে জগদ্ধাত্রীর ছবি পেয়েছি তা হল :-

মন্দির জায়গা জেলা প্রতিষ্ঠাকাল (খৃষ্টীয়) জগদ্ধাত্রীর বৈশিষ্ট্য
চন্দ্রনাথ শিব হেতমপুর বীরভূম ১৮৪৭ সিংহবাহিনী, নীচে হাতি
আনন্দভৈরবী কালী সুখারিয়া হুগলী ১৮১৩ সিংহবাহিনী, নীচে হাতি
রামেশ্বর শিব ইলামবাজার বীরভূম ১৯শ শতক সিংহবাহিনী (জোড়া সিংহ), নীচে হাতি নেই
রাসমঞ্চ, বড় তরফ হদল-নারায়ণপুর বাঁকুড়া ১৯শ শতক জোড়া সিংহ ও নীচে জোড়া হাতি
জোড়বাংলা কালী ইটণ্ডা বীরভূম ১৮৪৪ সিংহবাহিনী, নীচে হাতি নেই
গিরিগোবর্ধন কোতুলপুর বাঁকুড়া ১৯শ শতক সিংহবাহিনী, নীচে হাতি নেই
চারবাংলা বড়নগর মুর্শিদাবাদ ১৭৫৫ সিংহবাহিনী, নীচে হাতি নেই
গঙ্গেশ্বর বড়নগর মুর্শিদাবাদ ১৭৫৩ সিংহবাহিনী, নীচে হাতি নেই
*লক্ষ্মীজনার্দন দেবীপুর পূর্ব বর্ধমান ১৮৪৪ সিংহ নেই, দেবী জোড়া হাতির উপর
*শিবমন্দির বনকাটি পশ্চিম বর্ধমান ১৮শ শতক সিংহ নেই, দেবী জোড়া হাতির উপর

*এই মূর্তিদু’টি আদৌ জগদ্ধাত্রীর কিনা, তা বিতর্কিত।

প্রসঙ্গতঃ এগুলি সবই টেরাকোটা ফলকের কাজ।

খ) জগদ্ধাত্রীর রূপ

উপরের তালিকা থেকে এটা পরিস্কার যে সবক্ষেত্রে শাস্ত্র মেনে জগদ্ধাত্রীর অলঙ্করণ করা হয়নি।কয়েকটি মন্দিরে জগদ্ধাত্রীর সঙ্গে সিংহ থাকলেও হাতি নেই। উদাহরণ স্বরূপ, রামেশ্বর মন্দির, ইটণ্ডার কালীমন্দির, কোতুলপুরের গিরিগোবর্ধন মন্দির এবং বড়নগরের গঙ্গেশ্বর ও চারবাংলা মন্দির।

আবার কয়েকটি মন্দিরে জগদ্ধাত্রীর সঙ্গে সিংহ নেই, কিন্তু হাতি আছে (যদি এই ছবিটি আদৌ জগদ্ধাত্রীর হয়)। উদাহরণ দেবীপুরের লক্ষ্মীজনার্দন মন্দির ও বনকাটির শিবমন্দির।

আলোচনা

পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে জগদ্ধাত্রী নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি ওঠে তা হল জগদ্ধাত্রীর সংখ্যা দুর্গা বা কালীর তুলনায় এত কম কেন?

বলাই বাহুল্য এর কোনও সহজ উত্তর নেই।

মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র জগদ্ধাত্রী পূজা চালু করেন ১৮শ শতাব্দির প্রথমভাগে বা মাঝামাঝি, তাই তার আগে তৈরী মন্দিরে জগদ্ধাত্রী না থাকার পক্ষে যুক্তি থাকলেও ১৮শ শতকের শেষভাগে বা ১৯শ শতকে তৈরী হওয়া মন্দিরগুলিতে জগদ্ধাত্রীর অপ্রতুলতার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারন নেই। মন্দির অলঙ্করণ শিল্পীরা জগদ্ধাত্রীর বিষয়ে অজ্ঞ ছিলেন এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে জগদ্ধাত্রী দুর্গা বা কালীর মত সার্বজনীন ভাবে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিলেন না?

পণ্ডিতেরা হয়ত সঠিক উত্তরটি দিতে পারবেন।

উপসংহার

পশ্চিমবঙ্গের মন্দির অলঙ্করণে জগদ্ধাত্রী নিঃসন্দেহে একটি কৌতূহলোদীপক বিষয়। এর আরও বিস্তারিত আলোচনা হওয়া দরকার।

 

ছবি পরিচিতি–(উপর থেকে নীচ) ইলামবাজারের রামেশ্বর, ইটণ্ডাকালীমন্দির,চন্দ্রনাথ শিবমন্দির হেতমপুর, বনকাটি,দেবীপুরহদলনারায়ণপুর,আনন্দভৈরবী,চারবাংলা,গিরিগোবর্ধন-কোতলপুর,গঙ্গেশ্বর মন্দির।

সব ছবি লেখকের তোলা

 


Share your experience
  • 46
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    46
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।