থাইল্যাণ্ডে বিষ্ণু আরাধনা

Share your experience
  • 199
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    199
    Shares

অনিতা বসুঃ থাইল্যান্ড ভ্রমণ আধুনিক ভারতীয় সমাজে এখন অতি সহজ। প্রতিবছর বহু মানুষ এই দেশে বেড়াতে যান। প্রায় তিন লক্ষাধিক ভারতীয় বসবাস করেন এই দেশে। কিন্তু আমরা সেই দেশটি র অন্তরের শাশ্বত প্রবাহকে জানতে পারি নি। আজ আপনাদের কাছে এই দেশে র অপূর্ব এক কৃষ্টি ও সংস্কৃতি কে উপস্থিত করতে চেষ্টা করবো। একটু পিছিয়ে গিয়ে দেখবো শাশ্বতঃ ভারতের প্রবাহকে।

ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয়

একথা যেমন শ্বাশত  সত্য তেমন ভারতীয় ধর্ম-সংস্কৃতি-সভ্যতা সেই এক অদ্বিতীয় ব্রহ্মকে বহুধা রূপে আরাধনা করে এসেছে বহু প্রাচীন কাল থেকেই, সেটিও সত্য। বেদ এ যেমন অদ্বিতীয় ব্রহ্মর কথা আমরা পাই, আবার সেই ঋগ্‌বেদ এর ছত্রে অগ্নি, ইন্দ্র, সূর্য, বরুণ সহ রূদ্র, বিষ্ণুর উল্লেখও পাই। প্রাচীন কালের সত্যদ্রষ্টা ঋষিরা যে জগতৎপালনকারী শক্তিকে দ্যুলোক, ভূলোক, অন্তরীক্ষে প্রতীয়মান করেছিলেন, অনুভব করেছিলেন, পুরাণ, মহাকাব্য, শাস্ত্র, গ্রন্থ, পঞ্জিকা থেকে আপামর সাধারণ মানুষের হৃদয়ের কোন এক মনিকোঠায় তা সুপ্ত হয়ে রয়েই গেছে। কোথাও কখনো তা প্রকাশ পেয়েছে উচ্ছল নদীর স্রোতের ন্যায় কখনো বা তিরতির করে বহে চলেছে অন্তঃসলিলা ফল্গু নদীর মতো। আর এইসব কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে তৈরী হয়েছে বহু বিশিষ্ট সভ্যতার বিচরণ ক্ষেত্র। ঋগ্ বেদের ঋষি যেভাবে ত্রিবিক্রম বা উরুগায় অর্থাত্ বিস্তৃতভাবে বিচরণশীল এক পুরুষের উল্লেখ করেছেন সেখানে বিষ্ণুর সঙ্গে সূর্যকে অভিন্ন মনে করা হয়েছে। শতপথ ব্রাহ্মণ, তৈত্তিরীয় আরণ্যকে আর এক দেবতা পরিচিত ‘নারায়ণ’ নামে। যেখানে তিনি যজ্ঞপুরুষরূপে বিদ্যমান। শতপথ ব্রাহ্মণ এই যজ্ঞপুরুষ নারায়ণ এবং আদিত্যকে একই সঙ্গে আরাধনা করেছে। “স যঃ স বিষ্ণুর্যজ্ঞঃ স । স যঃ স যজৌ সৌ স আদিত্য ।।” (১৪.১.১৬)

মহাভারতে বিষ্ণু, নারায়ণ দুই নামই আছে

বৃষ্ণি বা বৃষ্ণি সাত্বত জনগোষ্ঠীর জনপ্রিয়তম মানুষটি বসুদেবপুত্র শ্রীকৃষ্ণ রূপে জন্মগ্রহণ করে আদিত্য, বিষ্ণু, নারায়ণ এর সাথে ভারতীয় সভ্যতায় একীভূত হয়ে গিয়েছেন। একই সাথে অদ্বিতীয় একক সত্তার এমন সুন্দরভাবে আবার তিন দেবসত্তার সমন্বিত রূপে প্রকাশিত হওয়ার মহান রূপটি ‘বিষ্ণু’কে কেন্দ্র করেই সর্বত্র বিরাজমান। বিষ্ণু গায়ত্রী মন্ত্রে উচ্চারিত হয়েছে — “ওঁ নারায়ণায় বিদ্মহে, বাসুদেবায় ধীমাহি, তন্নোবিষ্ণু প্রচোদয়াত্।” ভারতবর্ষের এই দেবতা রূপে ঈশ্বরীয় চিন্তা ও সাধনা বহু বহু প্রাচীন। আজ যে ভারতবর্ষের মানচিত্র আমরা দেখতে পাই পূর্বে সেই ভারতের পরিসর ছিলো বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতায় যে বাণী উচ্চারণ করেছিলেন — “যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাং স্তথৈব ভজাম্যহম্। মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্ব্বশঃ।” তা যেন সত্যই দেশ কালের গণ্ডীকে অতিক্রম করে এক বৃহত্তর ভারতের আঙ্গিনায় অবলীলাক্রমে ছড়িয়ে পড়েছে।

বঙ্গদেশের অতিনিকট প্রতিবেশী শ্যামদেশ, অধুনা থাইল্যাণ্ড। এই শ্যামদেশ ইন্দোচীন ভৌগোলিক রাজ্যের সীমারেখার মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রাচীন মালয় উপদ্বীপ ও ইন্দোচীনকে ভারতবাসী ‘সুবর্ণভূমি’ নামে আখ্যা দিয়েছিলো। সঠিক দিন, সালের হিসাব জানা নেই, তবে এই উপদ্বীপটির সঙ্গে সুপ্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার আদান-প্রদান বহুকালের। অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গের মানুষরা সমুদ্রযাত্রায় যেমন বিশেষ দক্ষ্য ছিলেন, তেমনি ব্যবসায়িক সূত্রে, রাজনৈতিক আদান-প্রদান তথা শিল্পী, ভাষ্করদের অনুপম সৃষ্টিদক্ষ্যতায়, অতি উন্নতমানের গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান শাস্ত্রে পারদর্শিতা সহ ব্রাহ্মণ্যকুলের বিভিন্ন রাজপরিবারে সসম্মানপ্রাপ্তির যোগ্যতার নিরিখে, রাজপদ অধিকারে ‘ভারতবর্ষ’ নিজস্ব স্বমহিমায় বিরাজ করে গেছে বর্হিভারতের এই প্রতিবেশী দেশগুলিতে। আর এই সবকিছুর মধ্যে দিয়েই, ঐতিহাসিক দিন-কালের হিসাবকে অতিক্রম করে ভারতীয় দেবদেবীরাও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে আজও প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে এই বৃহত্ ভারতের প্রাঙ্গনে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের সাংস্কৃতিক গৌরবের যুগ যেমন প্রচ্ছন্ন ছাপ ফেলেছিলো বর্হিভারতের কৃষ্টিতে তেমনি শ্রীবিজয়া, চোল, পল্লব, ও বাংলার পাল রাজাদের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রভাব পড়েছিলো এই প্রতিবেশী দেশগুলিতে। বিগত কয়েক বছরের থাইল্যাণ্ডে বসবাস করার সৌজন্যে এবং ন্যাশনাল মিউজিয়াম ব্যাঙ্কক এর সংস্পর্শে এসে এই প্রভাব অতি বিশদে চোখে পড়েছে। আর সত্যিই আপ্লুত হয়েছি একটি ঘোষিত বৌদ্ধধর্মাবলম্বী দেশের শ্রীবিষ্ণুর আরাধনা, সম্মান প্রদর্শন দেখে।

 থাইল্যাণ্ডে বিষ্ণু
থাইল্যাণ্ডের আপামর মানুষের কাছে ভারতীয় শ্রীবিষ্ণু পরিচিত ফ্রা বিষিণু, ফ্রা নারাই, ফ্রা রামা, অথবা ফ্রা কিষিণা রূপে। ফ্রা কথাটির অর্থ হলো অত্যন্ত উচ্চ সম্মানীয় দেবতা, বা গুরু। যে বিষ্ণুরূপী নারায়ণকে বেদ-পুরাণ গায়ত্রী মন্ত্রে ভারতবর্ষ আরাধনা করেছে এ যেন তারই প্রতিধ্বনি। থাইল্যাণ্ডের বিষ্ণু আরাধনার ইতিহাস বা প্রত্নতাত্ত্বিকদের প্রদর্শিত তথ্য থেকে সংগৃহীত করেছি কিছু কথা, আর কিছু দৈনন্দিন সজীব জীবনযাত্রার সঙ্গে সেই ফ্রা বিষ্ণু বা ফ্রা নারাই এর নিগুঢ় যোগাযোগ প্রত্যহ দেখতে পাই।

এ লেখা কোন ঐতিহাসিক বা প্রত্নতত্ত্ববিদের রচনা নয়, এক ভারতীয় নারীর নিজ দেশের সনাতন সভ্যতার চরণচিহ্ন খুঁজে পাওয়া দেশের গণ্ডীর বাইরে। এক শিল্পীর চোখে দেখা কিছু ভাষ্কর্য্য, এক অপূর্ব শৈল্পিক সৃষ্টিশীলতাকে দর্শন করার রচনা, এক অনুসন্ধিত্সু মানবীর চোখে দেখা রাজকীয় ঐতিহ্য মণ্ডিত কিছু অনুষ্ঠানের রূপরেখা — আর এই সবকিছুর সঙ্গেই সংপৃক্ত হয়ে আছে একটি নাম, তিনি শ্রীবিষ্ণু।

 

থাইল্যাণ্ডের ইতিহাসে বিষ্ণু

থাইল্যাণ্ডের প্রাচীন ইতিহাসের পাতায় বিষ্ণু আরাধনা প্রায় ষষ্ঠ, সপ্তম শতাব্দী থেকেই প্রচলিত। হয়তো তারও আগেও আরো কিছু ছিলো কিন্তু সর্বপ্রাচীন যে বিরাট পাথরের মূর্ত্তিটি সেটি শ্রীবিজয়া সাম্রাজ্যের শাসনকালে, খুব সম্ভবত সপ্তমশতাব্দীর মধ্যভাগে। টাকুয়া পা নামক শহর থেকে প্রাপ্ত। তামিলনাড়ুর সঙ্গে এই শহরের বৈদেশিক বাণিজ্য তথা শাসন ব্যবস্থার সাথেও যোগাযোগ ছিলো। টাকুয়া-পা থাইল্যাণ্ডের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। এই শহরটি আন্দামান সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলের অধীনে। হিন্দু রাজাদের সংস্পর্শে থাকার জন্য এই প্রদেশে অনেক বিষ্ণুর মূর্ত্তি, শিবলিঙ্গ-বা অন্যান্য ভারতীয় দেবদেবীর চিহ্ন পাওয়া গেছে। টাকুয়া-পা হতে প্রাপ্ত বিষ্ণুমূর্ত্তিটি পাথরের নির্মিত, উচ্চতায় প্রায় ২ মিটার ৩৫ সেন্টিমিটার। মুখশ্রী খুব বেশী মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত বর্তমানে, কিন্তু অপূর্ব তার দেহসৌষ্ঠব, চারটি হাতও ক্ষতিগ্রস্ত। বর্তমানে ব্যাঙ্ককের জাতীয় জাদুঘরে প্রতিষ্ঠিত। টাকুয়া-পার একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসস্থল থেকে প্রাপ্ত এই মূর্ত্তিটি, মন্দিরটি একটি ছোট পাহাড়ের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। ফ্রা নয়হিল নামে উল্লিখিত। কথিত আছে এই মন্দির সংলগ্ন বৃহত্ জলাশয়টি খনন করিয়েছিলো তখনকার বিখ্যাত বাণিজ্য সম্প্রদায় ‘কোদুম্বালুর মনিরঙ্গম’। সেখান থেকে প্রাপ্ত একটি শিলালেখএ প্রাচীন তামিলে উল্লেখ আছে এটির নাম — ‘অবনী নারানাম’ বা ‘অবনী নারায়ণ’ রূপে।

পরবর্তী পর্ব আগামী শুক্রবারে

তথ্যসংগৃহীত

(১) দেবদেবী ও তাঁদের বাহন — স্বামী নির্মলানন্দ, অষ্টম সংস্করণ, প্রকাশক — ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ। ১৪১৮।

(২) প্রতিমা শিল্পে হিন্দু দেবদেবী — কল্যাণ কুমার দাশগুপ্ত। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অ্যাকাদেমী। ২০০০, মে।

(৩) শিল্পে ভারত ও বর্হিভারত — মণীন্দ্রভূষণ গুপ্ত। আনন্দ পাবলিশার্স। তৃতীয় মুদ্রণ, মে ২০১১।

(৪) Brahmanism in South East Asia — Dawee Daweewarn, Sterling Publishers Private Limited.

(৫) Siamese State Ceremonies — Their History and function — H.G. Quaritech Wales., Bernard Quaritech Ltd. London, 1931.

(৬) Hindu Gods of Peninsular Siam — Stanley J. O’Connor. Yr. Arti bus Asiae. Switzerland, 1971.

(৭) Ancient Khmer Sites in North Eastern Thailand. (Khorat, Buriram and the Angkor-Phimai Route). by — Asger Mollerup, White Lotus Publication-2018.

(৮) A History of Indian Shipping and Maritime Activity — by — Radha Kumud Mookerjee, Longmans, Green And Co. 1912.


Share your experience
  • 199
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    199
    Shares

Facebook Comments

Post Author: অনিতা বোস

অনিতা বোস
– Mrs. Anita Bose. শ্রীমতী অনিতা বোস  বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ও  ভারতীয় শিল্প, ভারত তত্ত্ব এবং টেক্সটাইল ডিজাইন তার আয়ত্তে। ব্যাঙ্ককের জাতীয় মিউজিয়ামে বিগত  ৫ বছর  একমাত্র ভারতীয় গাইড রূপে পৃথিবীর বহু দেশের মানুষের কাছে এশিয়ার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কে পৌঁছে দিয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে, তাদের দেশীয় শিল্পে , ইতিহাসে ও ঐতিহ্যে ভারত সংস্কৃতির  প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। ২০১৯এ রামায়ণ চর্চা বিষয়ে বিশেষ বই লিখেছেন- রামায়ণ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পদচিহ্ন।২০১৩ সাল থেকে তিনি এই বিষয়গুলিতে অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন, যা ভারত, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ার সম্মানিত ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে।  তাঁর প্রথম বই ওড়িশার পটচিত্রে জগন্নাথ সংস্কৃতি 2018 সালে প্রকাশিত হয়েছিল।   তিনি নিজে একজন স্বশিক্ষিত শিল্পী,ভারতের পাশাপাশি থাইল্যান্ডে বিভিন্ন একক এবং গ্রুপ আর্ট প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন।  স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত , রামকৃষ্ণ মিশনের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন হস্তশিল্প শেখানোর কেন্দ্রে  তিনি আন্তরিক ভাবে  সংযুক্ত ।  ভারতের ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন  জায়গায় নারী ও শিশুদের জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে সহায়তা করছেন। বিদেশে বিভিন্ন আর্ট ওয়ার্কসপে র মাধ্যমে ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও সংস্কৃতি কেও পৌঁছে দিচ্ছেন পৃথিবীর নানা দেশে র মানুষের মনের গভীরে।

2 thoughts on “থাইল্যাণ্ডে বিষ্ণু আরাধনা

Comments are closed.