পশ্চিমবঙ্গের পীঠস্থান ৩ – ত্রিস্রোতার ভ্রামরী

Share your experience
  • 31
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    31
    Shares

ভ্রামরী মাতা

ধারাবাহিক–৩

আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

ভূমিকা

পীঠস্থানের প্রচলিত তালিকা অনুযায়ী ১৬ নম্বর স্থানে আছে ত্রিস্রোতা, এবং সেই হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের পীঠস্থানের তালিকায় তৃতীয় স্থানে আসে এই পীঠস্থানটি। দেবীর বাঁ পা এখানে পড়েছিল। এখানে দেবী হলেন ভ্রামরী ও ভৈরব ঈশ্বর। পীঠনির্ণয় তন্ত্রে বলা হয়েছে “ত্রিস্রোতায়াং বামপাদে ভ্রামরী ভৈরবেশ্বরঃ”। আজ আমরা এই ত্রিস্রোতা নিয়ে আলোচনা করব।

পীঠস্থানের তালিকায় ত্রিস্রোতা ও ত্রিস্রোতা বিতর্ক

ক) প্রচলিত তালিকা (ক্রমিক সংখ্যা – দেহাংশ – দেবী – ভৈরব) :

১৬ —- ত্রিস্রোতা ——————- বাম পদ ———————- ভ্রামরী —————————— অম্বর

খ) তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থের তালিকা (ক্রমিক সংখ্যা – দেহাংশ – দেবী – ভৈরব) :

১৬ —- ত্রিস্রোতা ——————- বাম পদ ———————- ভ্রামরী —————————— ভৈরবেশ্বর

গ) শিবচরিত গ্রন্থের তালিকা (ক্রমিক সংখ্যা – দেহাংশ – দেবী – ভৈরব) :

৪২ ——- ত্রিস্রোতা —————- ডান জানু ———————– চণ্ডিকা ————————- সদানন্দ

আবার জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধানের পীঠস্থানের তালিকায় ত্রিস্রোতার স্থান ৪৬ নম্বরে, যেখানে দেবীর ডান পায়ের অংশ পড়েছিল (দেবী পার্বতী ও ভৈরব ঈশ্বর)।

অতএব দেখা যাচ্ছে যে সব তালিকাতেই পীঠস্থানটি হচ্ছে ত্রিস্রোতা। কিন্তু এই একটি মিল ছাড়া আর তিনটি বিষয়ে (দেবীর নাম, দেহাংশ ও ভৈরবের নাম) বিভিন্ন তালিকার বক্তব্য বিভিন্ন রকম।

প্রথমে দেবীর নাম ধরা যায়। প্রচলিত তালিকা এবং তন্ত্রচূড়ামণিতে দেবীর নাম ভ্রামরী হলেও শিবচরিতে চণ্ডিকা এবং জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের তালিকা দেবীর নাম পার্বতী।

দ্বিতীয়তঃ, ভৈরবের নাম। প্রচলিত তালিকায় ভৈরবের নাম অম্বর, তন্ত্রচূড়ামণিতে ভৈরবেশ্বর, শিবচরিতে সদানন্দ এবং জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের তালিকায় আবার ভৈরবেশ্বর।

এবার আসা যাক দেবীর পতিত দেহাংশে। প্রচলিত তালিকা এবং তন্ত্রচূড়ামণিতে দেহাংশ হল বাম পদ, শিবচরিতে ডান জানু এবং জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের তালিকায় ডান পায়ের অংশ।

কবি ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে এ ব্যাপারে বলেছেন –

“তিরোতায় পড়ে বামপদ মনোহর। অমরী দেবতা তাহে ভৈরব অমর।।”

এখানে পীঠস্থান তিরোতা এবং দেহাংশ বাম পদ হলেও দেবী অমরী এবং ভৈরব অমর।

অতএব দেখা যাচ্ছে যে সম্পূর্ণ ব্যাপারটিই রহস্যময়।

এবার সবচেয়ে কঠিন সমস্যা হল ত্রিস্রোতার অবস্থান নিয়ে। ত্রিস্রোতা কোথায়?

ভ্রামরী মাতার বাঁ পা
ভ্রামরী মাতা ১
ভ্রামরী মাতা

সবচেয়ে সহজ উত্তরটি হল তিস্তা নদীর তীরে কোনও এক জায়গায়, কারন তিস্তা নামটি ত্রিস্রোতা থেকেই এসেছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু তিস্তা নদীর তীরে কোথায়?

তিস্তানদী ৩১৫ কিলোমিটার লম্বা। সিকিমের জেমু গ্লেসিয়ার থেকে শুরু তিস্তার, তার পশ্চিমবঙ্গের মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে রংপুর জেলার ফুলছড়িতে যমুনা তথা ব্রহ্মপুত্রে মেশে তিস্তা। এই ৩১৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোথায় ত্রিস্রোতা পীঠস্থান? সত্যিই কঠিন প্রশ্ন।

এর উত্তরে কেউ কেউ বলেন শালবাড়িই হল ত্রিস্রোতা। ভালো কথা, কিন্তু এই শালবাড়িটি কোথায় ?

শালবাড়ি বলে একটি জায়গা আছে আসামের বোড়োল্যাণ্ড অঞ্চলের বাকসা বা বাগসা জেলায়, কিন্তু প্রথমতঃসেখানকার শালবাড়ি নামটিই খুব বেশি পুরোনো নয়, আর দ্বিতীয়তঃ সেখানে খুব প্রাচীন কোনও মন্দির নেই।আবার শিলিগুড়ির কাছেও একটি শালবাড়ি আছে, কিন্তু তা তিস্তার কাছে নয়, বরং এই শালবাড়ির একদিকে মহানন্দা ও অন্যদিকে মেচী নদী। আবার জলপাইগুড়ি জেলার বোদাগঞ্জের যেখানে ভ্রামরী দেবীর মন্দির, সেই অঞ্চলটিকে শালবাড়ি গ্রামও বলে।

এই তো গেল শালবাড়ি রহস্য।

আবার কেউ কেউ বলেন জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ির কাছে জল্পেশ বা জল্পেশ্বর শিবমন্দিরই হল ত্রিস্রোতা পীঠস্থান। জল্পেশ্বরের পীঠস্থান হওয়ার দাবীর স্বপক্ষে একটি প্রমাণ হিসাবে বলা হয় যে এই শিবলিঙ্গের মাথায় সর্বক্ষণ তিনটি প্রাকৃতিক ধারায় জল পড়ে এবং এর কাছেই ত্রিস্রোতা বলে একটি ছোট নদী আছে। এখানে জল্পেশ শিবের শক্তি সিদ্ধেশ্বরী নামে পরিচিত, এবং কালিকাপুরাণ অনুসারে এই সিদ্ধেশ্বরীই পীঠদেবী।

আবার জল্পেশর মন্দির থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে গুপ্তযুগে (৩২০ – ৬০০ খ্রীষ্টাব্দ) নির্মিত প্রাচীন জটিলেশ্বর শিবমন্দিরের পাশেই অবস্থিত একটি বিগ্রহহীন মন্দিরকে স্থানীয়রা কামাক্ষা মায়ের নাভি বলে মানেন। তবে এই দেবীকে ত্রিস্রোতা পীঠস্থান বলে দাবী করা হয় না।

ত্রিস্রোতা ও ভ্রামরী দেবী বলে যে জায়গাটির দাবী বেশ জোরালো, তা হল ময়নাগুড়ির কাছে বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্ট রেঞ্জের মধ্যে অবস্থিত বোদাগঞ্জ গ্রামের ঘন জঙ্গলের ভিতরে দেবী ভ্রামরীর মন্দির, যেখানে দেবীর বাঁ পা পড়েছিল বলে দাবী করা হয়। এই জায়গাটির খুব কাছেই তিস্তা নদী। কেউ কেউ আবার এই ঘন শালজঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত এই জায়গাটিকেই শালবাড়ি বলে থাকেন।

আবার অন্যদিকে ভারতচন্দ্র বর্ণিত “তিরোতা” কি “ত্রিস্রোতা”-র অপভ্রংশ, নাকি তা “তিরহুত” বা “ত্রিহুত”-কে (উত্তর বিহারের একটি জায়গা) বোঝাচ্ছে? ত্রিহুত অঞ্চলে তো কোন প্রাচীন বা বিখ্যাত শক্তি মন্দির নেই, ঐ অঞ্চলটি রাম-সীতারই রাজত্ব।

-মনসা-মূর্তি-ভ্রামরী-মন্দির
ভ্রামরী মন্দিরে দেবদেবীর মূর্তি
বাইরের-মন্দিরের-দেবমূর্তি-ভ্রামরী-মন্দির.

তাহলে আসল ত্রিস্রোতা কোথায়?

বলাই বাহুল্য, এর কোনও সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর নেই। যদিও পূর্বা সেনগুপ্ত তাঁর বিখ্যাত “একান্নপীঠ” বইটিতে জল্পেশ্বরকেই পীঠস্থানের মর্যাদা দিয়েছেন (পৃষ্ঠা ১২১), কিন্তু বোদাগঞ্জের দাবিকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এক্ষেত্রে বর্তমান লেখকের মত হচ্ছে ‘মঝ্ঝিম পন্থা’, অর্থাৎ আমরা সাধারণ মানুষেরা পণ্ডিতদের ঝগড়াঝাঁটির মধ্যে না গিয়ে জল্পেশ্বর ও বোদাগঞ্জের মা ভ্রামরী দু’টি মন্দিরই দর্শন করে আমাদের ত্রিস্রোতা পীঠস্থান দর্শন পূর্ণ করবো।

ত্রিস্রোতার সন্ধানে

এই বিষয়টিকে আমরা বর্ণনার সুবিধার জন্য দুভাগে ভাগ করছি, যদিও প্রকৃতপক্ষে জল্পেশ্বর এবং বোদাগঞ্জের ভ্রামরী মন্দির একই সঙ্গে দেখা যায়, এবং ঐ দুটির সঙ্গে জটিলেশ্বরকেও জুড়ে নেওয়াই উচিত। আমরা এখানে প্রথমে বোদাগঞ্জ ও পরে জল্পেশ্বর নিয়ে আলোচনা করবো, কারন আর কিছুই নয়, আমি শিলিগুড়ি থেকে ওভাবেই গিয়েছিলাম।

বোদাগঞ্জ ভ্রামরী মন্দির

প্রথমেই বলা ভালো, বোদাগঞ্জের যেখানে ভ্রামরী দেবীর মন্দির, সেই অঞ্চলটিকে শালবাড়ি গ্রামও বলে। জায়গাটি বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্ট রেঞ্জের ঘন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত, এবং জনশ্রুতি এই জঙ্গলেই দেবী চৌধুরাণি ও তাঁর গুরুদেব ভবানী পাঠক থাকতেন।

আমরা শিলিগুড়ি থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে বেরোলাম। শিলিগুড়ি থেকে ইস্টার্ন বাইপাস ধরে চিকা মোড় দেবীনগর সাহুডাঙি হয়ে জলপাইগুড়ির দিকে চলেছি। পাশে পড়ছে তিস্তা ক্যানাল। কয়েকটি ছোট ছোট বসতি পার হয়ে পৌঁছলাম বেলাকোবা স্টেশনের কাছে। এখানে রেললাইন ক্রস করে পারমুণ্ডা রোড ধরে চললাম। পাশে চলেছে তিস্তা ক্যানাল। এই পথেই গাজোলডোবা বা তিস্তা ব্যারেজ। তবে আমরা গাজোলডোবা যাবো না, আমাদের টারগেট অন্য। দুপাশে ঘন জঙ্গল। এই সেই বিখ্যাত বৈকুণ্ঠপুর রেঞ্জ। জানা গেল এই জঙ্গলে হাতি আছে। তা থাক, এখন আমরা গণেশবাবাদের দর্শনে উৎসাহী নই, আমাদের টারগেট অন্য। এরপরে মিলনপল্লী আসতে রাস্তার ডান পাশে একটা বোর্ড চোখে পড়লো, তাতে অ্যারো দিয়ে ভ্রামরী মন্দিরের দিক দেখানো আছে। সাইনবোর্ডের পাশ দিয়ে একটা সরু পিচের রাস্তা ডানদিকে নেমে গেছে। আমরা দক্ষিণপন্থী হলাম।

গ্রামের রাস্তা। এঁকেবেঁকে চলে গেছে। দুপাশে জঙ্গল। মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়িঘর চোখে পড়ছে। কিছু কিছু গ্রামবাসীও। রাজগঞ্জ বলে একটি গ্রামে পৌঁছে বাঁদিকে একটা সরু রাস্তায় ঢুকলাম। এবারে জঙ্গল কমে এল। এখন দুপাশে পড়ছে ধানক্ষেত। বর্ষাকাল সবে শেষ হয়েছে। সজল মাঠে সতেজ সবুজ ধানগাছগুলি অল্প অল্প হাওয়ায় দুলছে।

এখানে রাস্তা ঢালাইয়ের। এবার এল ঢোলকপুর, তারপর টাকিমারী বাজার। এরপরেই এল বোদাগঞ্জ। এখান থেকে ডানহাতি টার্ন নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে কিছুটা যেতেই চোখে পড়ল ত্রিস্রোতা ভ্রামরী মন্দিরের নাম লেখা একটি সিমেন্টেরতোরণ। তার পিছনেই ভ্রামরী দেবীর মন্দির।

শিলিগুড়ি থেকে এলাম ৪৮ কিলোমিটার। সময় লাগলো প্রায় দু’ঘণ্টা।

শালবাড়ির শালজঙ্গল
শালবাড়ির শালজঙ্গল.
ভ্রামরী মন্দিরের টিনের চূড়া

ভ্রামরী মন্দির

গেটের বাইরে থেকে মন্দিরটি দেখে অবাক হয়ে গেলাম। সামনে নাটমন্দির সহ মূল মন্দিরটি কোরাগেটেড টিনের তৈরী। মূল মন্দিরটির দুটি চূড়া চোখে পড়লো – রাস্তার দিকেরটি অপেক্ষাকৃত ছোট এবং চারচালা রীতির, মাথায় ত্রিশুল। কিন্তু ভিতরদিকের চূড়াটি ২০-চালা। টিনের হলেও কুড়িচালা মন্দির আগে কখনও দেখিনি, এমনকি জানতামও না যে কুড়িচালা মন্দির হয়। পরে দেখেছিলাম মন্দিরটির আরও একটি চারচালা চূড়া আছে।

যাই হোক, গাড়ি থেকে নেমে চারদিকটা একটু জরীপ করলাম। রাস্তার এ পাশে একটা পুকুর, আর চারধারেই বড় বড় গাছের ভিড়। সন্ধ্যার পর নিশ্চয়ই একটা গা ছমছমে ব্যাপার হবে।

এবার মন্দিরের দিকে এগোলাম।

মন্দিরে ঢুকে বোঝা গেল চূড়া টিনের হলেও মন্দিরটি সিমেন্টের, এবং বেশ বড়। প্রথমেই একটি বড় বারান্দা, তারপর একটি বড় অ্যান্টেচেম্বার। সেখানে নানারকম দেব দেবীর মূর্তি। গর্ভগৃহটি বিশাল, এবং চারভাগে বিভক্ত। দর্শকদের দিক থেকে দেখলে একদম ডানদিকে আছে একটি শিবলিঙ্গ (ইনিই ভৈরব), তার বাঁদিকে অষ্টভূজা সিংহবাহিনী ভ্রামরী দেবীর নীল রঙের মৃন্ময় মূর্তি, তার বাঁদিকের কামরায় সাদা রঙের নন্দীসহ বিশালাকার মহাদেবের বসা মূর্তি এবং একদম বাঁদিকে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট কামরায় কালো রঙের চতুর্ভূজা ভয়ালদর্শনা কালীমূর্তি। এঁর সামনে সিঁদুর ভর্তি একটা থালার উপর সিঁদুর মাখা একটি কর্তিত ধাতব বাঁ পা। জানা গেল ইনিই হলেন দেবী ভ্রামরীর আসল মূর্তি।

দেবী দর্শন করে বেরিয়ে এলাম, এবার মন্দিরের অন্যপাশে গেলাম। এদিকে এসে মন্দিরের দিকে তাকাতেই সেই বিখ্যাত গাছটিকে দেখতে পেলাম। মন্দিরকে মাঝে রেখে দুপাশ দিয়ে দুটি গুঁড়ি উপরে উঠে গিয়ে মিশে গিয়ে একটি হয়ে গেছে উলটো (inverted) V অক্ষরের মতন। ইন্টারনেটে ভ্রামরী মন্দিরের খোঁজ করলেই এই গাছটির ছবি ভেসে উঠবে। দেখার মতই বটে। গাছটির গুঁড়িতে মানতের লাল আর হলুদ সুতো বাঁধা।

মন্দিরের এপাশে আর একটি মন্দির। তাতে কালী ছাড়াও শিব-সহ অন্নপূর্ণা ও কালী-সহ বামাক্ষ্যাপার মূর্তি আছে, তবে বোঝাই যাচ্ছে এগুলো সাম্প্রতিক কালের।

ভ্রামরী দর্শন শেষ হল। এবার যাত্রা জল্পেশ্বরের দিকে।

বিচিত্র আকৃতির গাছ, ভ্রামরী মন্দির
জলাশয়, ভ্রামরী মন্দির

জল্পেশ্বর

জল্পেশ্বর বা জল্পেশ জলপাইগুড়ি জেলার একটি প্রাচীন ও বিখ্যাত শিবমন্দির। স্কন্দপুরাণের কাহিনী অনুসারে মহারাজ জল্প এই শিবের পূজা করেছিলেন, তাই তাঁর নামে এই শিব জল্পেশ বা জল্পেশ্বর নামে পরিচিত হন। মহারাজ জল্প পূজা করলেও  জল্পেশ শিবলিঙ্গটি কিন্তু অনাদিলিঙ্গ, অর্থাৎ তা আগেই থেকেই ওখানে ছিল, এবং বলা হয় যে পীঠস্থান হিসাবে পরিচিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই এই শিবলিঙ্গ স্থানীয় অনার্যদের কাছে পূজা পেতেন। এই জল্পেশ শিবের শক্তি হলেন মহাদেবী সিদ্ধেশ্বরী, যাঁর মন্দিরও জল্পেশ মন্দিরের কাছেই। এই সিদ্ধেশ্বরীকেই একদল পণ্ডিত ভ্রামরী বলেন, অর্থাৎ এটিই ত্রিস্রোতা পীঠস্থান।

ঐতিহাসিক যুগে বিশু সিংহ ১৫২৪ খ্রীষ্টাব্দে এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। বিশু সিংহ ছিলেন কোচবিহারের মহারাজা নারায়ণের পিতা। মহারাজা নারায়ণ ১৫৬৩ খ্রীষ্টাব্দে মন্দিরটি নতুন করে বানান। এর ১০০ বছর পরে ১৬৬৩ খ্রীষ্টাব্দে মহারাজা প্রাণ নারায়ণ এই মন্দিরটিকে আবার নতুন করে বানান। এরপরে বৈকুণ্ঠপুরের জমিদার মহীদেব রাইকূট কোচবিহারের রাজাদের অধীনতা অস্বীকার করে নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন এবং জল্পেশ মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব রাইকূট রাজাদের হাতে যায়। ১৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দে রাজা যোগেন্দ্রদেব রাইকূটের পত্নী রানী জগদেশ্বরী দেবী মন্দিরটি পুনর্নিমাণ করেন।

জল্পেশ্বর দর্শন

বোদাগঞ্জ থেকে বেরিয়ে সোজা ভালো রাস্তা ধরে চলে এলাম রং-ধামালি চৌমাথা। তারপর রায়পুর চা বাগান। এখান থেকে খুব ভালো রাস্তা পাওয়া গেল। হু হু করে গাড়ি ছুটছে। পাতকাটা জোড়াকদম কালিয়াগঞ্জ ডেঙ্গুয়াঝাড় হয়ে রেল লাইন ক্রস করে গোসালা মোড় হয়ে বাঁ দিকে মোড় ঘুরে ময়নাগুড়ির দিকে চললাম। এবার এল পাহাড়পুর মোড়। তারপর ইন্দ্রা মোড় হয়ে ডানদিকে টার্ন নিয়ে একটা সরু রাস্তা ধরলাম। জানা গেল বড় রাস্তাটা গেছে ২০ কিলোমিটার দূরে ইন্দো-বাংলাদেশ বর্ডারে চ্যাংড়াবান্ধায়। যাই হোক, আমরা চ্যাংড়াও নই, বাঁধাও নই, তাই আমরা জল্পেশ্বরের রাস্তা ধরলাম। আন্দাজ পাঁচ কিলোমিটার যেতেই পৌঁছনো গেল জল্পেশ্বর মন্দিরে।

জল্পেশ্বর মন্দির

বোদাগঞ্জেরশান্ত আরণ্যক পরিবেশের পর জল্পেশের জাঁকজমক চোখে ধাক্কা দেয়। বিশাল তোরণ, বিশাল সান বাঁধানো চত্ত্বর, বিশাল গোম্বুজাকৃতি চূড়ার জল্পেশ মন্দির, চত্ত্বরে আরও অনেকগুলি বড় বড় মন্দির, চারধারে নানা রকমের দোকানপাট – সব মিলিয়ে ভক্তির চেয়ে ভয় উদ্রেক করে অনেক বেশি। জানা গেল শিবরাত্রির সময় এখানে কয়েক লক্ষ লোকের ভিড় হয়! নিঃসন্দেহে রাজকীয় ব্যাপার।

মন্দিরে ঢোকার জন্য লাইনের ব্যবস্থা। এমনকি দ্রুত দর্শনের জন্য কিঞ্চিৎ অর্থমূল্যের প্রয়োজন। ভালো কথা, কিন্তু এখন আমরা ছাড়া কেউ নেই, তাই টিকিট কাটবো কেন? কিন্তু জনপ্রতি দশ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হল – এন্ট্রি ফী।

ঝকঝকে শ্বেতপাথর দিয়ে বানানো মন্দির। গর্ভগৃহের মধ্যে একটু নীচু মত রেলিং দিয়ে ঘেরা জায়গায় একটা গর্তের মধ্যে জল্পেশ শিবলিঙ্গ। সব সময়েই জলে ডুবে থাকেন জল্পেশ। পূজার সময় জল সেঁচে ফেলা হলে জল্পেশকে দেখা যায়। কিন্তু এখন তো পূজার সময় নয়। তবে কি এতদূর এসেও জল্পেশের দর্শন পাবো না?

জল্পেশ সম্ভবতঃ আমাদের দুঃখ বুঝলেন। পুরোহিত শ্রী গোপাল ভট্টাচার্য একজন লোককে দিয়ে জল সেঁচে ফেলালেন। গর্তের নীচে এবড়ো-খেবড়ো পাথরের জল্পেশ শিবলিঙ্গ। গর্তের গায়ের একটি ফুটো দিয়ে কলের জলের মত জল পড়েই যাচ্ছে জল্পেশের মাথায়। দেখতে দেখতে জল্পেশ আবার জলের তলায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

পুরোহিতমশাই জানালেন মোট তিনটি প্রাকৃতিক জলের স্রোত জল্পেশের মাথায় পড়ে। ত্রিস্রোতা?

জল্পেশ মন্দিরের কাছেই আছে সিদ্ধেশ্বরী মন্দির – কালিকাপুরাণে বর্ণিত ভ্রামরী দেবী। এখনও নিত্যপূজা হয়।

দেবী দর্শন শেষ। এবার ফেরার পালা, তবে জটিলেশ্বর দেখে। তবে সে অন্য গল্প।

অন্য ভ্রামরী

পীঠনির্ণয়তন্ত্রের পীঠস্থানের তালিকায় আর একটি ভ্রামরী দেবীর পীঠস্থানের খবর পাওয়া যায়, সেটি হল তালিকায় ৩৪ নম্বর পীঠস্থানটি। সে সম্বন্ধে বলা হয়েছে পীঠস্থানের নাম জনস্থান, পতিত দেহাংশ চিবুক, দেবী ভ্রামরী এবং ভৈরব বিকৃতাক্ষ। অন্নদামঙ্গল কাব্যে কবি ভারতচন্দ্র এই পীঠস্থানটি সম্বন্ধে বলেছেন :

“জনস্থানে চিবুক পড়িল অভিরাম / বিকৃতাক্ষ ভৈরব ভ্রামরী দেবী নাম।”

কিন্তু এই জনস্থান-টি কোথায়? এ সম্বন্ধে কোন স্থির সিদ্ধান্ত না হলেও বেশীর ভাগ পণ্ডিতই মনে করেন এই পীঠস্থানটি মহারাষ্ট্রে নাসিকের কাছে, এর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কোনও সম্পর্ক নেই।

জল্পেশ শিবমন্দির
জল্পেশ ১
জল্পেশ শিবমন্দিরে গর্ভগৃহে যাওয়ার পথ
জল্পেশ শিবমন্দিরে
জল্পেশ শিবলিঙ্গ ও জলের ধারা

উপসংহার

কোনটি আসল ভ্রামরী, সে তর্কের কোনও শেষ নেই। উৎসাহীরা বোদাগঞ্জের ভ্রামরী মন্দির এবং জল্পেশের মন্দির দুটিই দর্শন করুন, ভ্রামরী দেবী ফাঁকি মেরে পালিয়ে যেতে পারবেন না। আর অতি উৎসাহীরা মহারাষ্ট্রে ভ্রামরীর খোঁজ করতে পারেন, যদিও মহারাষ্ট্রের সর্বজনগ্রাহ্য চারটি পীঠস্থানের (কোলহাপুরের মহালক্ষ্মী, তুলজাপুরের তুলজা ভবানী, মাহুরের রেণুকা মাতা ও নাসিকের কাছে বানীর সপ্তশৃঙ্গী মাতা) মধ্যে ভ্রামরীর উল্লেখ নেই।

আরও পড়ুন--পশ্চিমবঙ্গের পীঠস্থান ১ – বহুলা পশ্চিমবঙ্গের পীঠস্থান ২; উজানী পীঠ

 

 


Share your experience
  • 31
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    31
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায়

asish chottopadhyay
আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৯৫৬) দুর্গাপুরের একজন প্রতিথযশা স্ত্রীরোগবিশেজ্ঞ। দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানার হাসতালে ৩২ বছর অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে চাকরি করার পর এখন উনি সম্পূর্ণ ভাবে গরীব ও দুস্থ রোগীদের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখেছেন। দেশভ্রমণ, ফটোগ্রাফি এবং বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় লেখালেখি করা ওঁর নেশা। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বইতে ওঁর তোলা ফটো প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় লেখা ওঁর দুটি ব্যতিক্রমী উপন্যাস, একটি ছোটগল্প-সংগ্রহ, একটি কবিতার বই , একটি ছড়ার বই ও দুটি ভ্রমণকাহিনী আছে, যার মধ্যে একটি উপন্যাস (চরৈবেতি) দুবার আনন্দবাজার পত্রিকার বেস্ট সেলার লিস্টে স্থান পেয়েছিল। ইংরেজিতে ভারতের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও মেলা নিয়ে লেখা ওঁর শতাধিক ব্লগের প্রায় দেড় লক্ষ ভিউ আছে। বাংলার মন্দিরের উপর ওঁর ইংরেজিতে লেখা একটি গবেষণাধর্মী প্রায় দুহাজার রঙিন ফটোসমৃদ্ধ ফটোগ্রাফিক ই-বুক আছে, যেটি সাধারণ মানুষ, যাঁরা মন্দির ভালোবাসেন কিন্তু খুব পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখা পড়তে চান না, তাঁদের জন্য লেখা।।