উদ্ধারণ দত্ত- গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম এবং সপ্তগ্রামের ইতিবৃত্ত

Share your experience
  • 420
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    420
    Shares

উদ্ধারণ দত্ত- গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম এবং সপ্তগ্রামের ইতিবৃত্ত।প্রত্যেক বছর পৌষমাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে উদ্ধারণ দত্তের তিরোধান তিথিতে এখানে মহোৎসব পালন করা হয়।লিখছেন– শুভদীপ সিনহা।

উদ্ধারণ দত্ত ও সপ্তগ্রাম

 সপ্তগ্রামের ইতিবৃত্ত

সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁও হুগলী জেলার এক প্রসিদ্ধ স্থান। হাওড়া থেকে প্রায় ৪৩ কিমি দূরে এই স্থান অবস্তিত। পুর্ব রেলপথে বর্ধমান মেইন শাখায় এখানে একটি স্টেশন আছে। বাংলার হিন্দু রাজত্বকালে সপ্তগ্রাম একটি বিখ্যাত স্থান ছিল এবং সেইযুগে একটি তীর্থস্থান বলে গণ্য হত। কথিত আছে, পৌরাণিক যুগে কান্যকুব্জের রাজা প্রিয়ব্রন্তের সাত ছেলে গঙ্গা যমুনা সরস্বতীর সঙ্গমস্থলে সাতখানি বিভিন্ন গ্রামে তপস্যা করে ঋষিত্ব লাভ করেছিলেন বলে এর নাম হয় সপ্তগ্রাম। কবিকঙ্কণ মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল, বিপ্রদাস পিপিলাইয়ের মনসামঙ্গল, মাধবাচার্য্যের চন্ডী এবং লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি কবিরাজ ধোয়ীর প্রণীত “পবনদূতম” নামক প্রাচীন কাব্যে এই স্থানের উল্লেখ আছে। এক সময়ে এই স্থানের খ্যাতি সুদূর রোম অবধি বিস্তৃত ছিল। কেউ কেউ একে গ্রীকদের বর্ণিত গঙ্গারিডি রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী বলে মনে করেন।

ইংরেজ অধিকারের কিছু আগে সপ্তগ্রাম একটি বিখ্যাত বন্দর ছিল এবং এখানে দেশবিদেশের বাণিজ্যতরীর সমাগম হত। কিন্তু কাছের হুগলী বন্দরের ধীরে ধীরে গুরুত্ব বৃদ্ধি এবং সরস্বতী নদী মজে যাওয়ায় সমৃদ্ধশালী সপ্তগ্রামের পতন ঘটে এবং ক্রমে এর সমস্ত ব্যবসাবাণিজ্য হুগলীতে স্থানান্তরিত হয়। মুঘলদের হাতে পর্তুগীজদের সম্পূর্ণ পরাজয় হলে সপ্তগ্রামের ফৌজদার হুগলীতে নিজের দপ্তর এবং কার্য্যালয় স্থানান্তর করেন।

 বৈষ্ণব তীর্থ সপ্তগ্রাম ও উদ্ধারণ দত্ত

সপ্তগ্রাম এক বিখ্যাত বৈষ্ণব তীর্থ হিসাবে বহু আগে থেকেই প্রসিদ্ধ ছিল। এখানে দ্বাদশগোপালের অন্যতম সুবাহু নামের গোপাল শ্রীমদ উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরের শ্রীপাট অবস্থিত। তাঁর প্রকৃত নাম দিবাকর। ১৪৮১ খ্রিস্টাব্দে তিনি সপ্তগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শ্রীকর দত্ত এবং মাতা ভদ্রাবতী দেবী। যৌবনে পত্নী বিয়োগের পর তিনি গৃহত্যাগ করেন এবং সারা জীবন ধরে সাধন-ভজন ও বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করে ১৫৪১ খ্রীস্টাব্দে দেহরক্ষা করেন। উদ্ধারণ দত্ত শ্রীচৈতন্যদেবের প্রধান পার্ষদ নিত্যানন্দ প্রভুর প্রিয়পাত্র ছিলেন এবং তিনি এই স্থানে বহুদিন অবস্থান করেছিলেন বলে জানা যায়।নিত্যানন্দ তাঁর নতুন নামকরণ করেন ‘উদ্ধারণ’ অর্থাৎ যার হাত ধরে সুবর্ণবণিকদের জগত উদ্ধার হবে। অল্প কালের মধ্যেই তিনি শ্রী নিত্যানন্দের বিশেষ স্নেহভাজন নিত্যপার্ষদ হয়ে ওঠেন। শোনা যায় নিত্যানন্দ উদ্ধারণ দত্তের রান্না করা অন্ন ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করতেন না।
“স্বর্ণ বণিক উদ্ধারণ দত্ত ভক্তোত্তম।
যাহার পক্বান্ন নিতাই করেন ভক্ষণ।।”

নিত্যানন্দ

চৈতন্য মহাপ্রভুর নির্দেশে নিত্যানন্দ যখন বিবাহ করায় সম্মতি দেন তখন তাঁর জন্য পাত্রী খোঁজার ভার উদ্ধারণ দত্তের উপরেই বর্তায় এবং তিনি নিত্যানন্দের বিবাহে দশ হাজার টাকা ব্যয় করেন বলেও জানা যায়। নিত্যানন্দ সপ্তগ্রামে উদ্ধারণ দত্তের বাড়িতে নিয়মিত আসতেন এবং থাকতেন। উদ্ধারণ দত্ত সপ্তগ্রামে তাঁর নিজের বসতবাটিতে একটি রাধাবল্লভ মন্দির স্থাপন করেন যেখানে প্রভু নিত্যানন্দ নিজে হাতে একটি মাধবীলতা বৃক্ষ রোপন করেন। সেই গাছ আজও আছে।গৌড়ীয় বৈষ্ণব জগতে উদ্ধারণ দত্ত এক প্রাতঃস্মরণীয় উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। মহাকবি কর্ণপুরের শ্রীগৌরগণোদ্দেশ দীপিকা ‘য় উল্লেখ আছে – “সুবাহুয়োব্রজে গোপা দত্ত উদ্ধারণাখ্যক”। শ্রী রাজবল্লভ গোস্বামীর “শ্রীশ্রীমুরলী বিলাস”, অভিরাম দাসের “পাট পর্যটন” ইত্যাদি বৈষ্ণব শাস্ত্রগ্রন্থ মতে দ্বাপরের শ্রীধাম বৃন্দাবনের দ্বাদশ গোপালের অন্যতম ‘সুবাহু’ই কলিতে সপ্তগ্রামের উদ্ধারণ দত্ত রূপে জন্মগ্রহণ করেন।

 উদ্ধারণ দত্ত ত্রিশবিঘা

সে কালে দুর্ভিক্ষ ছিল বাংলার নিত্য সঙ্গী। সেরকমই এক দুর্ভিক্ষের সময় উদ্ধারণ দত্ত আদিসপ্তগ্রামে ত্রিশ বিঘা স্থান জুড়ে একটি অন্নসত্র খোলেন যা দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের দুই বেলা আহারের একমাত্র ভরসাস্থল ছিল। পরবর্তীকালে এই সমস্ত কৃতজ্ঞ মানুষদের তিনি বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করেন। এই ত্রিশ বিঘা অন্নসত্র থেকেই গ্রামটির নাম হয় ত্রিশ বিঘা। শুধু দুর্ভিক্ষ কবলিত মানুষই নয়, উদ্ধারণ দত্তের প্রভাবে সপ্তগ্রামের সমস্ত সুবর্ণবণিকরা দলে দলে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। শ্রী শ্রী নিত্যানন্দ মহাপ্রভু এবং উদ্ধারণ দত্তের সংস্পর্শে এসে হিন্দু সমাজে ব্রাত্য সুবর্ণবণিকরা প্রেম-ভক্তির নতুন দিশা খুঁজে পায়।বৃন্দাবন দাসের ‘শ্রীচৈতন্য ভাগবৎ’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধারণ দত্ত সম্পর্কে আছে —

   আরও পড়ুন  শ্রীপাট গোস্বামী মালিপাড়া -দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়েরে দেবতা

“উদ্ধারণ দত্ত ভাগ্যবন্তের মন্দিরে।
রহিলেন মহাপ্রভু ত্রিবেণীর তীরে।।
কায়মনোবাক্যে নিত্যানন্দের চরণ।
ভজিলেন অকৈতবে দত্ত উদ্ধারণ।।
যতেক বণিককুল উদ্ধারণ হইতে।
পবিত্র হইলো, দ্বিধা নাহিক ইহাতে।।
বণিক ত্বরিতে নিত্যানন্দ অবতার।
বণিকের দিলা প্রেমভক্তি অধিকার ।। ”

 ফুল সমাধি

বৃন্দাবনে তাঁর মূল সমাধি-মন্দির থেকে কিছু ফুল নিয়ে এসে পরে সপ্তগ্রামের বর্তমান শ্রীপাটে তাঁর প্রিয় মাধবীলতা গাছটির পাশেই একটি পুষ্পসমাধি মন্দির নির্মাণ করা হয়। প্রত্যেক বছর পৌষমাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে উদ্ধারণ দত্তের তিরোধান তিথিতে এখানে মহোৎসব পালন করা হয়।

  শ্রীপাট সপ্তগ্রাম

সপ্তগ্রামে অবস্থিত শ্রীমদ উদ্ধারণ দত্তের শ্রীপাটে একটি মন্দিরে শ্রীগৌরাঙ্গদেব ও শ্রীনিত্যানন্দসহ উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে এবং তাঁর একটি ফুলসমাধি আছে। এই বিগ্রহদের নিত্যসেবা হয় এবং প্রতি বৎসর সাড়ম্বরে শ্রীমদ দত্ত ঠাকুরের তিরোভাব মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উৎসব উপলক্ষে বহু ভক্ত নরনারী ও বৈষ্ণব মহান্তদের সমাগম হয়ে থাকে এবং অতিথি সেবা এবং ভোগ বিতরণ করা হয়।১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে এখানে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় যা আজও বর্তমান ।মন্দিরটি কালের নিয়মে জীর্ণ হয়ে যায়। এদিকে সরস্বতী নদীতে পলি পড়ে যাওয়ার ফলে সপ্তগ্রামের সুবর্ণবণিকরা একে একে পাড়ি জমাতে থাকে হুগলি-চুঁচুড়া-চন্দননগর ও কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে। পরে হুগলী জেলার সাব-জাজ শ্রী বলরাম মল্লিকের তৎপরতায় মন্দিরটি সংস্কার করা হয়।

 তিরোভাব তিথি উদযাপন

কোলকাতা, হুগলী, চুঁচুড়া ইত্যাদি নানা স্থানে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সুবর্ণবণিক পরিবারগুলি এগিয়ে আসে এবং ১৮৯৯ সালে একটি সভা ও পরে একটি সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সমিতির প্রধান কার্যভারের মধ্যে ছিল জীর্ণ মন্দিরটির সংস্কার, উদ্ধারণ দত্তের তিরোভাব দিবস উদযাপন ও শ্রীপাটের সংরক্ষণ। পরবর্তী কালে এই বার্ষিক সভা স্বজাতি সম্মেলনীতে পর্যবসিত হয়। শোনা যায় সুবর্ণবণিক সম্প্রদায়ের প্রতিটি সভাতে দেড় হাজারেরও বেশী জনসমাগম হত, এবং কোলকাতার সুবর্ণবণিক সভার অনুপ্রেরণাও এই সম্মেলন থেকেই আসে বলেও অনেকে মনে করেন।এপ্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, বর্ধমানের উদ্ধারণপুর গ্রামে উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরের সমাধি মন্দির প্রতিষ্ঠিত আছে।

তথ্যসূত্রঃ-১) পশ্চিমবাংলার পূজা-পার্বণ ও মেলা- সম্পাদনাঃ- অশোক মিত্র
২) হুগলী হেরিটেজ ব্লগ
৩) হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজঃ- সুধীরকুমার মিত্র
৪) বৃহৎবঙ্গ(দ্বিতীয় খন্ড)–দীনেশচন্দ্র সেন


Share your experience
  • 420
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    420
    Shares

Facebook Comments

Post Author: শুভদীপ সিনহা

শুভদীপ সিনহা
শুভদীপ সিনহা।সরকারি আধিকারীক।ক্ষেত্রসমীক্ষক ও লোকসংস্কৃতি চার্চায় বিশেষ আগ্রহী।

2 thoughts on “উদ্ধারণ দত্ত- গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম এবং সপ্তগ্রামের ইতিবৃত্ত

Comments are closed.