উজানি শুধু ঐতিহাসিক স্থান নয়,জড়িয়ে আছে একালের দুই কবির স্মৃতি

Share your experience
  • 270
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    270
    Shares

উজানি শুধু ঐতিহাসিক স্থান নয়,জড়িয়ে আছে একালের দুই কবির স্মৃতি।আজকের মঙ্গলকোট থানার অন্তর্ভুক্ত মঙ্গলকোট, কো গ্রাম, আড়াল ইত্যাদি স্থান মধ্যযুগে উজানিনগর এবং উজানির দুর্গ নামে পরিচিত ছিল। উজানি কিন্তু একটি পীঠস্থান – দেবী এখানে মঙ্গলচন্ডী এবং ভৈরব কপিলাম্বর।
“উজানিনগর অতি মনোহর, বিক্রমকেশরী রাজা।
করে শিবপুজা উজানির রাজা, কৃপা কৈল দশভূজা ।”লিখছেন–ডা.তিলক পুরকায়স্থ।

উজানির মন্দির
উজানির মন্দির

 উজানি প্রাচীন সাহিত্যে

আবার বিজয়গুপ্তের লেখায় পাচ্ছি চাঁদ সওদাগর ও উজানির বিবরণ-
” চম্পকনগরের রাজা উজানিতে গেলা।
সাত শত চলিয়াছে সোনারূপার দোলা।”

এই উজানিনগরেই বাস ছিল চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের ধনপতি ও তাঁর পুত্র শ্রীমন্ত সওদাগরের। উজানির দেবী মঙ্গলচন্ডী, আর ধনপতি সওদাগরের স্ত্রী খুল্লনা মঙ্গলচন্ডী দেবীর পরম ভক্ত। কিন্তু শিব ভক্ত ধনপতির এইসব লৌকিক গ্রাম্য দেবদেবীর উপরে কোন ভরসা নেই। তাই স্ত্রীর অনুরোধেও তিনি মঙ্গলচন্ডী দেবীর পুজো করেন না, তাঁর এক কথা-” স্ত্রী দেবতার আমি পূজা নাহি করি।”আবার উজানিনগর চম্পকনগর বা চম্পাইনগরের চাঁদ সওদাগরের পুত্রবধূ বেহুলার বাপের বাড়ি, বা সায় বেনের বাড়ি। বংশীদাসের পদ্মপুরাণে কি লেখা আছে দেখেনি-
” উজানিনগর তথি, গন্ধবনিক জাতি
সাহেরাজা বড় ধনেশ্বর।
তার কন্যা বিপুলা, রূপে জিনি চন্দ্রকলা
সেহি কন্যার যোগ্য লখিন্দর।”

প্রাচীন পীঠস্থান উজানি

মঙ্গলকোটের দেবী বলে উজানির চণ্ডী- মঙ্গলচণ্ডী নামে পরিচিত হন।
অন্নদামঙ্গলে আছে-
” উজানিতে কফোনি মঙ্গলচণ্ডী দেবী।
ভৈরব কপিলাম্বর শুভ যাঁরে সেবী।।”

১৩২০-১৩২১ বাংলা সনে, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মনীন্দ্রমোহন বোস এবং হরিদাস পালিত, উজানি মঙ্গলকোটের বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন গুলি ঘুরে দেখেন এবং ১৩২২ সালে বর্ধমানে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনে এবিষয়ে একটি প্রতিবেদন পেশ করেন। তার অংশ বিশেষ উদ্ধৃতির মধ্যে তুলে ধরছি।

উজানির মঙ্গলচণ্ডী
উজানির মঙ্গলচণ্ডী

মঙ্গলচণ্ডী

” উজানি একটি পীঠস্থান। তথায় দেবী ভগবতীর কনুই পতিত হইয়াছিল। দেবী মঙ্গলচন্ডী এবং ভৈরব কপিলাম্বরের অবস্থানের জন্য উজানি বা মঙ্গলকোট হিন্দুমাত্রেরই তীর্থস্থান।…..মন্দিরপ্রাঙ্গনে প্রবেশ করিতে হইলে পশ্চিমপার্শ্ব দিয়া পূর্বমুখে প্রবেশ করিতে হয়। বর্তমান মন্দিরটি দক্ষিণদ্বার। দীর্ঘে ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি, প্রস্থে ২১ ফুট। মন্দির মধ্যে কাঠের সিংহাসনের উপরে পিত্তলময়ী দশভুজা মহিষমর্দিনী সিংহবাহিনী চন্ডিকা দেবী বিদ্যমান রহিয়াছেন । তাঁহার সিংহাসনের পুরোভাগে একটি প্রস্তরের বৃষ। বামে প্রস্তরের পলতোলা কৃষ্ণবর্ণ লিঙ্গমূর্তি, ইহারই নাম কপিলেশ্বর।”

অর্থাৎ এই বর্ণনা অনুসারে জানা যাচ্ছে যে, ১০০ বছর আগে এই মূর্তিটি ছিল, পিত্তলময়ী দশভুজা মহিষমর্দিনী সিংহবাহিনী দেবী। বোঝা যাচ্ছে চন্ডীমঙ্গল কাব্যে বর্ণিত বনদেবী অভয়া মূর্তি, প্রাচীন কালের কোন এক সময়ে পরিবর্তিত হয়ে, আর্য সমাজের মা দুর্গায় পরিণত হয়ে গেছিলেন। এই মূর্তিটিও ৯০ এর দশকে চুরি হয়ে যায়। তখন মল্লিক উপাধিধারী গ্রামের এক ধনী পরিবার, ১৯৯৪ সালে ,বর্তমানের কষ্টিপাথরের দশভুজা মূর্তিটি নির্মাণ করে দেন। তখন থেকে এই কষ্টিপাথরের মূর্তিটির পূজা হচ্ছে। বংশানুক্রমে স্থানীয় রায় পদবিধারী ব্রাহ্মণরা মন্দিরের সেবায়েত।

 তথাগতের মূর্তি

এই মন্দিরের মধ্যে একটি চমৎকার বজ্রাসনে উপবিষ্ট তথাগতের মূর্তি আছে। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এই মূর্তির বয়স অনুমান করেছিলেন-নবম/দশম শতকের, সম্ভবত পাল যুগের।এখানে জানিয়ে রাখি যে, নিকটবর্তী লোচনদাসের পাটের কাছ থেকে উনি ষোড়শ জৈন তীর্থঙ্কর শান্তিনাথের একটি মূর্তি সংগ্রহ করেছিলেন।

বিনয় ঘোষের লেখায় পড়েছি, উনি কবি কুমুদরঞ্জনের কাছে শুনেছিলেন যে , একদা অজয় ও কুনুরের গর্ভ থেকে প্রচুর বৌদ্ধ ও হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি উদ্ধার হয়েছিল। সেসব এখন জনগণেশের ঘরে।কোগ্রামের অন্যতম বিখ্যাত উৎসব হচ্ছে উজানির মেলা। প্রতি বছর ১ লা মাঘের দিন, অজয়ের চরে, মকর স্নান উপলক্ষ্যে বিশাল মেলা বসে। এছাড়াও দোল পূর্ণিমার দিনে হয় মঙ্গলচণ্ডী পুজো, মহোৎসব আর মেলা।

 লোচনদাসের স্মৃতি

বর্তমানে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া সাবডিভিশনের কেতুগ্রাম ১ ব্লকের অন্তর্গত হচ্ছে কো গ্রাম। একে দুই বাহুডোরে ঘিরে আছে, অজয় নদ এবং কুনুর নদী।সুলতানি আমলে উজানি ছিল- পরগনা অজমৎ সাহীর এক অংশ। তখন এর নাম ছিল- সুগ্রাম।ধনী বণিকদের বাণিজ্যপোতগুলি তখন ভ্রমরার দহে বাঁধা থাকত। এইখানেই জন্মেছিলেন চৈতন্যমঙ্গলের কবি লোচনদাস । তিনি এই জায়গার নাম দেন কো গ্রাম। উনার স্ত্রী এর পূর্বে এই স্থানকে কুগ্রাম বলে ডাকতেন। এই নিয়ে প্রচলিত মত হচ্ছে- অতি কম বয়সে লোচনদাসের বিবাহ হয়। বিবাহের পরে পরেই গুরুগৃহে বিদ্যাশিক্ষা আরম্ভ হয়। এর অনেকদিন পরে শ্বশুর বাড়িতে যাবার সময়, রাস্তা চিনিয়ে দেবার জন্য, পথিমধ্যে এক কিশোরীকে ‘মা’ সম্বোধন করে, কিশোরীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে বুঝতে পারেন যে, যাঁকে তিনি মা ডেকেছেন, সেই কিশোরী আদতে তাঁর স্ত্রী। লজ্জায় স্ত্রীকে ফেলেই নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। ক্ষুব্ধ স্ত্রী কুপিতা হয়ে শ্বশুরবাড়ির গ্রামের নাম দেন- কু গ্রাম।

কুমুদরঞ্জন মল্লিক
কুমুদরঞ্জন মল্লিক

 কুমুদরঞ্জন মল্লিকের বাড়ি- উজানি

আমরা গেছিলাম অজয়- কুনুরের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত, লোচন দাসের পাটে। ফাঁকা মাঠের মধ্যে দক্ষিণমুখী সমাধিগৃহে, পিরামিড সদৃশ সমাধিটি। অতি সামান্য দূরেই অজয়ের ধারে কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের গৃহ-‘মধুকর’।”বাড়ি আমার ভাঙন ধরা অজয় নদীর বাঁকে,জল যেখানে সোহাগ ভরে স্থলকে ঘিরে রাখে”দক্ষিণ বঙ্গের ভালোবাসা, এই দুষ্টু দামাল ছেলে অজয়। ওর ছোটবেলায় , সেটা আমাদেরও ছোটবেলা, ও একটু দুষ্ঠু ছিল ঠিকই, কিন্তু এখন পরিণত বয়সে এসে একদম শুধরে গেছে। জন্মসূত্রে ও মুঙ্গেরিলাল, অর্থাৎ মুঙ্গেরে উৎপত্তি। অজয়ের ইতিহাস অতি প্রাচীন। অনেকে বলেন গ্রীক পর্যটক মেগাস্থিনিসের বর্ণিত আমিষ্টিস নদীই সম্ভবত বর্তমানের অজয় নদ।

অজয় নদ

দেওঘরের দক্ষিণ পশ্চিমের এক নাতিউচ্চ টিলা থেকে জন্ম নিয়ে , বিহার, ঝাড়খণ্ডের মধ্যে দিয়ে , পশ্চিম বর্ধমানের চিত্তরঞ্জনের কাছে সিমজুড়ি দিয়ে , অজয় প্রবেশ করেছে বাংলায়।কিন্তু ওর পুরো কর্ম ভূমি পশ্চিম , পূর্ব বর্ধমান এবং কিছু পরিমানে বীরভূম জুড়ে। আর কাটোয়া শহরে গিয়ে ভাগীরথী নদীতে আত্ম বিসর্জন।

কুনুরের স্মৃতি

অন্যদিকে পশ্চিম বর্ধমানের উখরা থেকে উৎপন্ন হয়ে ছোট্ট কুনুর নদী, মঙ্গলকোটের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়ে, অজয় নদে গিয়ে আত্ম-সমর্পন করেছে। তবে কোগ্রামের কুনুর নদীকে দেখে দুঃখ হয়, কিছুমাত্র তার প্রায় অস্তিত্ব নেই।আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল, কুমুদ রঞ্জন মল্লিক, কবি জয়দেব, এঁদের সবার বাড়ি অজয়ের ধারে। শান্তিনিকেতন থেকেও অজয় বেশি দূরে নয়।এই অজয়ের ধারেই কিন্তু পাওয়া গেছে সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক পাণ্ডু রাজার ঢিপি।

আমরা রয়েছি কোগ্রামে , অজয়- কুনুরের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত, লোচন দাসের পাটে। অতি সামান্য দূরেই কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের গৃহ-‘মধুকর’। কুমুদরঞ্জনের জন্ম ১৮৮৩ সালের ৩ রা মার্চ, কোগ্রামের মাতুলালয়ে। অবশ্য উনার পিতার বাড়িও নিকটবর্তী শ্রীখন্ড গ্রামে। বর্ধমানের মাথরুন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে, এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রূপে ১৯৩৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন। উল্লেখযোগ্য যে এই বিদ্যালয়ে কুমুদরঞ্জনের ছাত্র ছিলেন, আরেক বাংলা কাঁপান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

 কাজী নজরুল ইসলাম উজানিতে

কিন্তু কিভাবে সাক্ষাৎ ঘটেছিল গুরু- শিষ্যের ? অভিভাবকহীন বাউন্ডুলে কবির বাল্য জীবনের সে এক উল্লেখযোগ্য পর্ব।
চুরুলিয়ার মক্তবে পড়া শেষ, বাবা মারা গেছেন যখন কবির বয়স মাত্র ৯ বছর। কাকা বজলে করিমের হাত ধরে লেটো গানের দলে প্রবেশ করে নামডাক যত হচ্ছে, পয়সা কড়ি কিন্তু আদৌ তেমন কিছু হচ্ছেনা। বালক কবি তাই আবার খুঁজতে লাগলেন কোথায় বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়ার সঙ্গে স্কুলের পড়া চালান যায় ? একজন খোঁজ নিয়ে এলেন বর্ধমানের মঙ্গলকোটের নিকটে মাথরুন নবীনচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের, সেখানে নাকি কাছেই আছে কুলসোনা নামক সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের গ্রাম। মাথরুন স্কুলের মুসলিম ছাত্রদের সেখানে বিনামূল্যে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু শর্ত হচ্ছে উর্দু যেন শিক্ষার অন্যতম ভাষা হয়। এই মাথরুন স্কুলে নজরুলের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল কবি কুমুদ রঞ্জন মল্লিকের সংস্পর্শে আসা।

আরও পড়ুন- ন্যাংটাতলা ও ডুমনী মা -লোকমাহাত্ম্য ও লোকগাথায় ঊজ্জ্বল

উজানিতে কবিতীর্থ
উজানিতে কবিতীর্থ

গুরুশিষ্য সংবাদ–উজানি

নজরুল এসে উঠলেন এই মুসলিম হোস্টেলে, মেধাবী ছাত্র সোজা ভর্তি হলেন ক্লাস সিক্সে কিন্তু উর্দুর বদলে নিলেন সংস্কৃত, আবার সময় অসময়ে গাছে উঠে আপন মনে বাজাতেন তাঁর আড় বাঁশিটি। মৌলবী সাহেবতো রেগেই টং, বেয়াদব ছেলে সংস্কৃত পরে আবার বাঁশি বাজায়, জানেনা যে মুসলিম ধর্মে বাঁশি বাজানো হারাম। একজন গিয়ে ধরে নিয়ে এলো নজরুলকে। বলা হলো বাঁশি বাজান বন্ধ করতে, নজরুল কিন্তু বাঁশি বাজানো বন্ধ করতে অসম্মত হন , উল্টে বাঁশিতে একটি ইসলামি সংগীত বাজানো শুরু করেন। এবারে মৌলভী সাহেব খুশ কিন্তু নজরুল সঙ্গে সঙ্গে মনস্থির করে নেন ফিরে আসার, বাঁশি বাজানোতেও ধর্মীয় অনুশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর সৃষ্টিশীল মন বিদ্রোহ করে উঠল । চলে এলেন প্রিয় শহর আসানসোলে, প্রথমে যোগ দিলেন কবি বাসুদেবের লেটো গানের দলে, সেখান থেকে জনৈক বাঙালি খ্রিষ্টান রেলের গার্ড সাহেবের বাড়ি হয়ে কাজ নিলেন এম এ বক্সের বেকারীতে। এই কাহিনী হয়ত অনেকেই জানেন আবার অনেকেই জানেননা।

দেখুন উজানি মঙ্গলচণ্ডী 


Share your experience
  • 270
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    270
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।