উত্তরবঙ্গের কামতাপুরের গোসানী চণ্ডীঃইতিহাস ও কিংবদন্তী

Share your experience
  • 24
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    24
    Shares

 আবির ঘোষ

 

উত্তরবঙ্গের প্রাচীন কামতাপুর রাজ্যের বা গোসানীমারি গ্রাম বর্তমান কোচবিহার জেলার সদর শহর থেকে ১৪ মাইল পশ্চিম দক্ষিণে  এবং দিনহাটা স্টেশন থেকে ৫ মাইল পশ্চিমে কামতপুর রাজ্যের প্রাচীন খেন রাজবংশের  ভগ্নপ্রায় রাজপাট বা দুর্গ আর তাঁদের কুলদেবী কান্তেশ্বরী চণ্ডী মন্দির অবস্থিত।

” গোসানী করহ পূজা , সুখে রবে যত প্রজা,
রাজা হবে নাম কান্তেশ্বর।।”( গোসানীমঙ্গল , পৃ . ৭০ )

গোসানীচণ্ডী মূলক কিংবদন্তী

প্রচলিত কাহিনীটি বেশ উপভোগ্য।আনুমানিক পঞ্চমদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই কামতপুরের  জামবাড়ি গ্রামের অঙ্গনা নামে এক গৃহবধূ প্রত্যেকদিন শিবপুজো করতেন । পরে স্বামী ভক্তিশ্বরের মুখে চণ্ডীমাহাত্ম্য শুনে মনস্থির করলে এবং দেবী চণ্ডী আকাশবাণীতে  পূজা পদ্ধতি জানালে অঙ্গনা ভক্তিভরে চণ্ডীপূজা করতেন । দেবী চণ্ডীর বরে অঙ্গনার গর্ভে এক শুভদিনে শুভক্ষণে পুত্র নীলধবজ জন্মগ্রহণ করেন। দেবীর নির্দেশ মতো পুত্রের ডাক নাম রাখা হলো কান্তনাথ।

বালক কান্তনাথের পাঁচ বছর বয়সকালে তাঁর পিতার মৃত্যু ঘটে । এই শিশু পুত্রকে প্রতিবেশী এক ব্রাহ্মণ তাঁর রাখাল রূপে নিযুক্ত করেন। বিভিন্ন স্থান থেকে ক্ষেতের শস্য নষ্ট করার অভিযোগ শুনে একদিন ব্রাহ্মণ গিয়ে দেখেন যে বালক কান্তনাথ গাছের নিচে গভীর নিদ্রা মগ্ন আর দেবী গোসানী চণ্ডীকার নির্দেশে এক সাপ ফনা তুলে তাঁকে রৌদ্রের তাপ থেকে রক্ষা করছে। অবাক ব্রাহ্মণ ঘুমন্ত বালকের হাতে পায়ে রাজলক্ষণ দেখে কিছু না বলে চলে যান এবং সেদিন হতে তাঁর রাখালের কাজ বন্ধ হয়। ব্রাহ্মণ কান্তনাথকে প্রতিজ্ঞা করান যে , কান্তনাথ কামতপুরের রাজা হলে তাঁকে রাজগুরুর পদে নিযুক্ত করবেন।

রাত্রিতে দেবী চণ্ডী বালক কান্তনাথকে স্বপ্ন দেখালেন যে , সকালে কাজলীকুড়া সরোবরে স্নান করে পূর্ব দিকে মকর , কুমির , সাপ এই তিন প্রাণীকে দেখতে পাবে । মকর ধরলে তাঁর বংশ চিরকাল থাকবে ; কুমির ধরলে বংশবৃদ্ধি হবে আর সাপ ধরলে সে নির্বংশ হবে। পরদিন যথারীতি মকর , কুমির দেখে তিনি ভয়ে ধরতে পারলেন না। তারপর সাপের পেছন দিক স্পর্শ করলে দেবী চণ্ডী তাকে একযুগের রাজা হবার বরদান দেন।

দেবীর চণ্ডীর নির্দেশে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা তাঁর জন্য সুন্দর রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। চণ্ডীর নির্দেশে হাতি , ঘোড়া , দোকানপাট , লোকজন সব হলো। এরপর কান্তনাথ রাজা নীলধবজ রূপে কামতাপুরের রাজসিংহাসনে বসে ” খেন ” রাজবংশের সূচনা করেন। রাজপ্রাসাদে পারিবারিক দেবী হিসেবে দেবী কান্তেশ্বরী চণ্ডী বা গোসানী দেবীর পুজোর সূচনা করেন।

ইতিহাস মতে , এই খেন বংশে পরপর তিনজন রাজা রাজসিংহাসন লাভ করেন । রাজা নীলধবজের পর পুত্র চক্রধবজ রাজসিংহাসনে বসেন। তাঁর রাজত্বকালেই গোসানী চণ্ডী রূপে কবচ মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয় । কথিত আছে , ” কামরূপের রাজা ভগদত্ত কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে কৌরবপক্ষে যোগদান করেন , তাঁর মৃত্যুর পর সেই কবচ যুদ্ধক্ষেত্রে পরে ছিল। একটি বাজপাখি সেই কবচটি উড়িয়ে নিয়ে যাবার সময় কামতা রাজ্যে পড়ে যায়। যা ” স্ফটিক কুড়ার ” পাশে শিমূল গাছের নিচে ছিলো। মধুজালির কাছে রাজা জানতে পেরে তা উদ্ধার করে নিত্যপূজার ব্যবস্থা করেন।

চক্রধবজের পর এই খেন রাজবংশের সর্বশেষ রাজা হন নীলাম্বর। রাজা নীলাম্বরের পাঁচজন রাজমহিষীর মধ্যে কনিষ্ঠা রানীর সাথে মন্ত্রী শশীপাত্রের পুত্র মনোহরের অবৈধ প্রণয়ে লিপ্ত– এই মিথ্যা সন্দেহ বশে রাজা নীলাম্বর মনোহরকে বন্দি করে হত্যা করেন। তারপর ছোটো রানীকে তাঁর মাংস রান্না করতে বলেন  এবং মন্ত্রী শশীপাত্রকে নেমন্তন্ন করে পুত্রের মাংস পিতাকে খাওয়ান , কিন্ত মাংসের মধ্যে পুত্র মনোহরের আংটি দেখতে পেয়ে ক্রোধে এই অপমানের প্রতিশোধ নেবার জন্য তিনি গৌড়ের সুলতান হুসেন শাহের দরবারে হাজির হন এবং তাকে কামতপুর রাজ্য আক্রমণ করার পরামর্শ দেন। বারোবৎসর দুর্গ অবরোধ করার পর হুসেন শাহ কূটচালে ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে রাজা নিলাম্বরকে পরাজিত করে বন্দি করেন এবং কথিত আছে ,  নবাব রাজঅন্তঃপুরে প্রবেশ করে পাঁচরানীকে স্পর্শ করা মাত্রই পাথর হয়ে যান । রাজা নীলাম্বরকে বন্দি করে গৌড়ে নিয়ে যাবার সময় রাজা দেবী চণ্ডীর নির্দেশে কাজলীকুড়ায় স্নান করতে গিয়ে দেবী গোসানী চণ্ডীর কাছে চলে যান বা আত্মহত্যা করেন। নবাবের আদেশে মন্দির ও প্রাসাদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হন এবং দেবী গোসানী চণ্ডীকে কাজলিকুড়ার জলে নিক্ষেপ করেন।

পরবর্তী কালে ” কোচ ” রাজবংশের মহারাজা প্রাণনারায়ণ   ( রাজত্বকাল ১৬২৬ – ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দ ) দেবী চণ্ডী কর্তৃক স্বপ্নদিষ্ট হয়ে ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে  প্রাচীন এই কামতাপুরের দিনহাটার গোসনিমারীর গ্রামে কাজলীকুড়া দীঘি থেকে কামতেশ্বরী চণ্ডী কবচকে  উদ্ধার করে নবনির্মিত মন্দিরে স্থাপন করে পূজার ব্যবস্থা করেন।

গোসানীচণ্ডী

বর্তমানে কোচবিহার দেবত্র ট্রাস্ট বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে এই মন্দির পরিচালিত হয়। দেবীর স্নান , দৈনিক দশোপচারে পূজা , অন্নভোগ , শয়ান ইত্যাদি চলে আসছে প্রত্যেকদিন। ১৩৬৩ বঙ্গাব্দে মূল কবচরূপিনী চণ্ডী চুরি হয়ে গেলে বর্তমানে ছিন্নমস্তার মূর্তি রেখে দেবীর পুজো চলে আসছে। প্রতিবছর বৈশাখ মাস ধরে দেবীর বিশেষ পূজা ছাড়াও অষ্টমী , চতুর্দশী , পূর্ণিমা , অমাবস্যা , সংক্রান্তি ইত্যাদি ৭৫ টি পর্বে দেবীর   ষোড়শোপচারে পূজা , হোম ও পাঁঠাবলি হয়ে থাকে । ভক্তগণ পাঁঠা ও কবুতর বলি দিয়ে থাকেন। এ। ছাড়াও অম্বুবাচী , দুর্গাপূজা ও কালীপূজায় বিশেষ সমারোহে পূজা হয়ে থাকে। শারদীয়া দুর্গাপুজোর মহাষ্টমীর দিন মোষ বলি হয়।

মহারাজা প্রাণনারায়ণ সুদূর মিথিলার দারভাঙা থেকে মৈথিলী ব্রাহ্মণ ঝা পরিবারকে দেবী কামতেশ্বরী চণ্ডী বা গোসানী দেবীর সেবা পূজার জন্য এখানে নিয়ে আসেন। মহারাজা প্রাণনারায়ণ এই পরিবারকে দেবোত্তর ও ব্রহ্মোত্তর ভূসম্পত্তি দান করেন । সেই সময় থেকেই এই পরিবার দেবী কামতেশ্বরী পূজারী ও সেবাইত হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন । এই ঝা পরিবারকে ” বড় দেহুরী পরিবার ” ও বলা হয়।  পুজো ছাড়াও রাজপরিবারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন এই পরিবার । এই পরিবারের পূর্বপুরুষ ৺রতিনাথ ঝা কোচবিহার রাজদরবারে শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশন করতেন।  বর্তমানে  তুফানগঞ্জের মুগাভোগ উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষক প্রদীপ ঝা গোসানীমারির এই প্রাচীন পরিবারের সদস্য ।

তথ্যসূত্র :- ” গোসানীমঙ্গল ” ৺রাধাকৃষ্ণ দাস বৈরাগী বিরোচিত , সম্পাদনা :- ডঃ নৃপেন্দ্রনাথ পাল ,” ইতিকথায় কোচবিহারের ” ডঃ নৃপেন্দ্রনাথ পাল

” কোচবিহারের ইতিহাস ” প্রথমখন্ড :- খানচৌধুরী  আমানতউল্লা আহমেদ ,

এই মন্দিরের সেবাইত এবং আমার প্রিয় শিক্ষক মহাশয় শ্রীযুক্ত Pradip Jha  sir  এর কাছ হতে ১৯ শে জানুয়ারি ২০১৭ সালে প্রাপ্ত কিছু তথ্য।

 


Share your experience
  • 24
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    24
    Shares

Facebook Comments

Post Author: আবির ঘোষ

আবির ঘোষ
আবির ঘোষ।থাকেন কোচবিহারের জেলার সদর শহরে।নেতাজি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় M.A করছেন। ভালো লাগে কোচবিহারের ঐতিহ্য নিয়ে লেখালিখি করতে এবং কোচবিহারের স্থানীয় কিছু পত্র - পত্রিকায় লেখালিখি প্রকাশিত হয়েছে।