বৈষ্ণবকবি আউলিয়া মনোহর দাস

Share your experience
  • 41
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    41
    Shares

দেবপ্রিয় দে

পথিক হারায়ে পথ,পথে পথে ভ্রমে,

দিবাকর অস্তগামী  পুবে-পশ্চিমে,

কি করিবে কোথা যাবে ভাবে মনে মনে-

হঠাৎ হইল দেখা নকুলের সনে।।

এ পথ সে পথ ঘুরে বীরভূম হতে

অবশেষে  রাস্তা শেষ অহল্যাবাঈ  রোডে।।

সে স্থানে বাস করে কৃপারাম সিংহ।

মনোহর স্থাপিল সেথা রাধা বিগ্রহ।।

নিবাস কাটোয়া তার বাইগন কোলা গ্রাম,

শ্রীচৈতন্যের বদনগঞ্জ সাধনার ধাম।।

” আদিনাম মনোহর চৈতন্য নাম শেষ।

আউলিয়া হইয়া বুলে স্বদেশ বিদেশ।।”

পদকর্তা জ্ঞানদাস বন্ধু মোর হয়

সবিশেষ পরিচয় পরে পরে রয়।

প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব কবি মনোহর দাস। ইনি কোন কূলে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁর পিতার মাতারই বা নাম কী,তাহার কিছুই আর জানিবার উপায় নাই। জ্ঞানদাসের সমসাময়িক কবি ছিলেন তিনি।

চৈতন্য চরিতামৃতে নিত্যানন্দ শাখায় মনোহর দাসের নাম উল্লেখ আছে-“শংকর মুকুন্দ জ্ঞানদাস মনোহর।”নিত্যানন্দ পরিবারভুক্ত প্রাচীন ভক্ত মনোহর। ‘সারাবলী’ গ্রন্থে তার আর একটি নাম ছিল চৈতন্য। এ কারণেই  আজও কিছু কিছু মানুষের ভ্রম হয় বুঝিবা স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  চৈতন্যের পদরজ স্পর্শ  করেছিল বদনগঞ্জের মাটি। ‘নবদ্বীপ মণ্ডল ডেভেলপমেন্ট  ট্রাষ্ট ‘,শ্রীধাম মায়াপুর থেকে প্রকাশিত ‘ শ্রী শ্রী গৌড়মণ্ডল দর্শন’ এর সর্বশেষ সংস্করণে আমরা পাই বদনগঞ্জের কাছাকাছি যে গ্রামগুলোতে  উনি এসেছিলেন  পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত  গড়বেতা গ্রাম, হুগলীর খানাকুল,গৌরহাটি,ধূলেপুর ইত্যাদি।

,বর্ধমানের  বেগুনকোলা গ্রাম, যেখানে জন্মেছিলেন আউলিয়া মনোহর দাস বাউল যার পূর্বনাম চৈতন্য দাস।

বদনগঞ্জের পশ্চিমেতে গ্রাম কয়াস্থান

চতুর্দশক ব্যাপী হরিগুণ গান

যে নামে মাতিয়া ছিল আউল গোঁসাই,

সে কাহিনী বলিতেছি কথায় কথায়।

ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে  বর্ধমান  জেলার কাটোয়ার নিকট বাইগনকোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মনোহর দাস।শ্রীনিবাস আচার্য্যের শ্যালক রামচন্দ্র চক্রবর্তীর শিষ্য রামশরণ চট্টরাজ।মনোহর দাস এই রামশরণের নিকট মন্ত্রগ্রহণ করেন।” মোর ঠাকুরানীর শিষ্য মনোহর দাস।/আউলিয়া বলি তাকে সর্বত্র প্রকাশ।।” মনোহর দাস ও তার বন্ধু জ্ঞানদাস উভয়েই সর্বদা  একত্রে থাকিতেন এবং উভয়েই জাহ্নবীদেবীর মন্ত্রশিষ্য ছিলেন।মনোহর দাস আউলে গোঁসাই এর গুরু দত্ত নাম।’ অনুরাগবল্লী’-তে আমরা পাই-

” তিঁহো মোর গুরু তাঁর পদপ্রাপ্তি আশ।

তাঁর দত্ত নাম মোর মনোহর দাস।

কাঠোঙা নিকট বাইগনকোলা পাটবাড়ী।

সেখানে বসতি আর ছাড়ি সর্ববাড়ী।”

 

নানা স্থানে তিনি ভ্রমন করিতেন।এইজন্য ইহার কোনো নির্দিষ্ট বাসস্থান ছিল না।কেবল বিষ্ণুপুর রাজবাটীর  নিকট ইহার বাসগৃহ ছিল।”বিষ্ণুপুরে মোর ঘর হয় বারো ক্রোশ।/রাজার দেশে বাস করি হইয়া সন্তোষ।। ”

বনবিষ্ণুপুরের রাজা বীরহাম্বীরের ভক্তিগ্রন্থ ভাণ্ডারের ভাণ্ডারী ছিলেন। বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণকরে ইনি নানা তীর্থ পর্যটন  করেন।খেতরীর মহোৎসবে তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন জ্ঞানদাসকে সঙ্গে করে নিয়ে।’নরোত্তম বিলাসে’ মহোৎসব বিবরণে তাঁহার নাম পাওয়া যায়।  কৃষ্ণপ্রেমে পাগলের ন্যায় ভ্রমণ ঙ্করতেন বলে  সাধারণ  লোকে তাঁকে ‘আউলিয়া মনোহর’ বলিত। সুবিখ্যাত কবি ও পণ্ডিত ছিলেন তিনি।অনেক বৈষ্ণব গ্রন্থসংগ্রহ করেছিলেন।তাঁহার গ্রন্থ সকল বদনগঞ্জ নিবাসী মহাপ্রভু শ্রী নিত্যানন্দের পরিকর উদ্ধারণ দত্তের বংশাবতংস শ্রীযুক্ত হারাধন  দত্ত ভক্তিনিধি  মহাশয়ের  নিকট সংগৃহীত ছিল,যাহা পরবর্তীকালে পণ্ডিত দীনেশচন্দ্র সেন  সংগ্রহ  করে নিয়ে  যান। ‘নির্যাস তত্ত্ব’ এবং  ‘ পদসমুদ্র’ বাবা মনোহর দাসের সংগৃহীত যাহাতে  পনেরো হাজার পদ আছে। মনোহর ছিলেন সুপ্রসিদ্ধ কীর্তন গায়ক।তাঁর  প্রবর্তিত কীর্তন গানের ঘরানা মনোহরশাহী কীর্তন নামে সুপরিচিত।এমনকি তাঁর নামানুসারে একটি পরগনা মনোহরশাহী নামে সুপরিচিত হয়ে ওঠে যা পরবর্তীকালে কেয়ুগ্রাম থানায় পরিণত হয়েছে।

সখিভাবে  শ্রীরাধাকৃষ্ণের  ভজনসাধন করতেন তিনি।তিনি ঘাঘরা  পরতেন, কাঁচলি বক্ষে আঁটতেন,মাথায় সিঁন্দুর পরতেন।নিজে  আক্ষেপ করে মুরলীকে  বলতেন-

” শ্যামের মুরলী, হৃদয় খুবলী,করিলি সকল নাশ।

যাহার  যে রীতি না ছাড়ে কখনও,কহে মনোহর দাস।।”(পদসমুদ্র- ১৪০৪৩)

কথিত আছে একবার আদিবাসী শ্রমিকরা কৃপারাম সিংহের বাড়ির নিকট আউলে গোঁসাই এর পাটবাড়ির পাশে একটি পুকুর খনন করছিল। আউলে গোঁসাই শ্রমিকদের  কাছে গিয়ে তাদের কাজ লক্ষ্য করছিলেন কিন্তু গোঁসাই ঠাকুরের বাবা দেখেন গোঁসাই  প্রত্যেক শ্রমিকের কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন।এখন এতগুলি শ্রমিকের মধ্যাহ্ন ভোজের ব্যবস্থা কে করবে? গোঁসাই তখন গোটা সীম খোলাসহ আমড়া ও গোটা বিড়িকলাই  দিয়ে খিচুড়ি রান্না করেছিলেন।সঙ্গে ছিল বেগুনপোড়া, কোনো কারণে একজন শ্রমিক অনুপস্থিত  থাকায় মাটি খুঁড়ে তার খিচুড়ি অন্ন পাথর দিয়ে চাপা দিয়ে রাখেন।এক বৎসর পর সেই শ্রমিক আউলে গোঁসাই এর সাথে দেখা করতে এলে তিনি বলেন তার প্রসাদ গাছ তলায় মাটি চাপা দেওয়া আছে। শ্রমিকটি সেই স্থান খুঁড়ে অবাক বিস্ময়ে দেখে সেই খিচুড়ি প্রসাদ  তখনও গরম আছে।এরকম নানা অলৌকিক কাহিনীতে মোড়া পরম ‘ বৈষ্ণব’  আউলে গোঁসাই এর জীবন কাহিনী। ১৭৩৫খ্রীস্টাব্দের  ২৯ শে পৌষ বদনগঞ্জে ভাবসমাধিস্থ হন আউলিয়া মনোহর দাস যিনি আমাদের কাছে আউলে গোঁসাই নামে অধিক পরিচিত।আর মৃত্যুর আগে রেখে গেলেন ভাবীকালের জন্য তাঁর অমর সৃষ্টিগুলি- ‘ পদকল্পতরু’,’ জয়রাগবী’,’ প্রেমবিলাস’,’ অনুরাগবল্লী’।শ্রীযুক্ত সুশান্ত চ্যাটার্জ্জী মহাশয়ের বর্তমান বসতবাড়ির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে আজও তাঁর সমাধি মন্দির বিদ্যমান যেটি বর্ধমান  রাজা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত।

এমনি ছিল গো দিন সুখে আর দুঃখে,

বৈষ্ণবের পদরজ এ ধরার বুকে

কালের আহ্বানে এল মাড়োয়ার জাতি

ধীরে ধীরে গড়িল সে বিপুল বসতি।

একদা বাজিত যেথা করতাল খোল-

মাড়োয়ার স্থাপিল সেথা নানক -অস্থল।

বাঁকুড়ার আসনা থেকে গঞ্জে আগমন

‘গ্রন্থসাহেব’ সনে পাতিল আসন।

জমিদার  মনুলাল ভকতের পূর্বপুরুষগণ  ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে বাঁকুড়ার আসনাই থেকে বদনগঞ্জে আসেন।শ্রীযুক্ত জয়দেব চ্যাটার্জ্জীর বর্তমান বসতবাড়ীই ছিল একদা জমিদার নিবাস।সেখানে নিত্য রাধাগোবিন্দের পূজার্চনা, যা আজও পরমনিষ্ঠার সঙ্গে বর্তমান।পরবর্তীকালে  এটি জমিদারদের নাচমহল রূপে ব্যবহৃত হত।তার ঠিক পাশেই বাবু ভকতের বর্তমান নিবাসস্থল ছিল ঘোড়া বাকুল যেখানে  জমিদারদের ঘোড়া পরিচর্যা করা হত। পাঠক লক্ষ্য করবেন  তৎকালীন দিনে কোনো বড় রাস্তা ছিলনা, সবটাই ছিল  পায়ে হাঁটা ও ঘোড়া চলাচলের পথ।তারও পশ্চিমে শ্রীযুক্ত প্রতাপচন্দ্র দালালের পুরাতন  বসতবাটি ছিল ছবিবাকুল যেখানে  ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রাস উৎসবে  বিভিন্ন রকম  ছবির খাটাল করা হত।অনেক পরে  বর্তমানে যেখানে শ্রদ্ধেয়   জগৎ চন্দ্র ভকত ও স্বর্গত বিজয়চন্দ্র ভকতের বসতবাড়ি নির্মিত হয় এবং ধনলক্ষ্মীর পূজা শুরু হয়। এই মন্দিরের  ঠিক  সামনেই রাস্তার বিপরীত দিকে ছিল রাস মঞ্চ যাহা  আজ ভগ্নপ্রায় অবস্থায় নীরব ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

বর্তমান ‘মাতৃমেডিক্যাল’ও তার পার্শ্ববর্তী আনুমানিক  এক বিঘা জমির ওপর ছিল ভকতদের নানক-অস্থল। এই অস্থলটিতে যে একদা বিষ্ণুর উপাসনা হত তা আমরা পূজারী ব্রাহ্মণের  কাছ থেকেই জানতে পারি।পঞ্চরেখ দেউল রীতির এই মন্দিরের একটিই দরজা যার  ওপরে গণেশের মূর্তি বসানো ও চূড়ায় গড়ুর বাহনের উপর চক্র। পরবর্তীতে এটি অস্থলে রূপান্তরিত হয় যেখানে ছিল স্নান ও পানের জন্য ইঁদারা ও রাত্রি যাপনের জন্য আরামগৃহ। ছিল রন্ধন কক্ষও  এবং কিছু পরে খনন করা একটি কুয়া। কত না সাধু সন্ত মহন্তের পদধূলি মিশেছে এই নানক অস্থলে।পরম যত্নে সেবাইত  মনুলাল ভকত ও তার যোগ্য সহধর্মিণী সৌদামিনী ভকত তাদের  আতিথেয়তা প্রদান করেছেন বংশানুক্রমে। কথিত আছে বাবা ভুবনেশ্বর এর মন্দিরটিও ভকতদের পূর্বপুরুষদের প্রতিষ্ঠিত। যে পেতলের রথটি আজও বদনগঞ্জের ঐতিহ্য,তাহা মনুলাল ভকত ও সৌদামিনী ভকত কর্তৃক শ্রীবিষ্ণুর পাদপদ্মে উৎসর্গীকৃত।

জাতিতে মাড়োয়ার হওয়ায় ভকতদের পূজিত দেবতা ধনলক্ষ্মী। বংশানুক্রমেই এনারা ধনতেরাস পালন করে আসেন।  তাই সাড়ম্বরে বছরের পর বছর ধরে লক্ষ্মীপুজো হত।আর পুরাতন  ভিটায় অর্থাৎ নাচমহলে রাস উৎসবের সময় নতুন ভিটা থেকে পুরাতন  ভিটাতে বাড়ির মহিলাদের যাতায়াতের  জন্য পথ নির্দিষ্ট ছিল মাটির তলার সুরঙ্গ কারণ জমিদার বাড়ির মহিলারা তখনও জনসমক্ষে আসতেন না ও মুখও দেখাতেন না।পর্দানসীন প্রথা তখনও প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে এই সুরঙ্গ সম্পর্কে বহু কিংবদন্তি গড়ে উঠেছে। মাড়োয়ারদের বিপুল জমানো  সম্পত্তি ধীরে ধীরে জমা হতে থাকে মাটির নীচের এই সুরঙ্গের বিভিন্ন গুপ্ত কক্ষে। কিংবদন্তী আছে যে– যে গুপ্তধন যক্ষের মত আগলানোর জন্য অজ্ঞাত পরিচয় এক শিশুকে এই সুরঙ্গের পথে ঠেলে  ফেলে দেওয়া হয়,তার অতৃপ্ত আত্মা যক্ষের মত সেই বিপুল ধনরাশি আজও আগলে চলেছে।

ভকতদের পূর্বপুরুষ গুরুদাস ভকতের প্রতিষ্ঠা করা সেই নানক-অস্থল আজ আর নেই।নেই নাচমহল,ঘোড়াবাকুল কিংবা ছবিবাকুল। সবই আজ প্রোমোটারদের হাতে।ভগ্নপ্রায় গুরুদুয়ারটি বুকে একরাশ নীরব অভিমান  নিয়ে কালের গহ্বরে বিলীয়মান।  যে ‘গ্রন্থসাহেব’টি একদা পূজিত হত,সেটিও আজ আর নেই,তার বর্তমান ঠিকানা  এখন চন্দ্রকোণার নানক-অস্থল।

 

তথ্যঋণ

১)বিশ্বকোষ চতুর্দশ ও অষ্টাদশ খণ্ড২) চৈতন্যচরিতামৃত৩) নরোত্তম বিলাস৪) প্রেমবিলাস৫) অনুরাগবল্লী

ঋণস্বীকার

১) মঞ্জুলা ভকত,২)মীরা চ্যাটার্জ্জী৩) সঞ্জীব  ভকত৪)জগৎচন্দ্র ভকত৫)জয়দেব চ্যাটার্জ্জী৬) সুশান্ত চ্যাটার্জ্জী৭) অরুণ মুখার্জ্জী৮) বংশীবদন দালাল৯)কিশোরীলাল ভকত।

চিত্রগ্রহণে সহায়তা

দেবজ্যেতি চ্যাটার্জ্জী  ও সুমন্ত রায়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Digiprove sealCopyright secured by Digiprove © 2019 Koulal Koulal


Share your experience
  • 41
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    41
    Shares

Facebook Comments

Post Author: দেবপ্রিয় দে

দেবপ্রিয় দে
দেবপ্রিয় দে।শিক্ষক ক্ষেত্রসমীক্ষক।লোকশিল্পী।