বৈষ্ণবমেলা– বৃহত্তর কাটোয়া মহকুমায় কেন এতো বেশি হয়?

Share your experience
  • 181
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    181
    Shares

বৈষ্ণবমেলা অগ্রদ্বীপ
বৈষ্ণবমেলা অগ্রদ্বীপ

বৈষ্ণবমেলা– বৃহত্তর কাটোয়া মহকুমায় কেন এতো বেশি হয়? শহর কাটোয়াতে কোন বৈষ্ণবমেলা না বসলেও কাটোয়া মহকুমার একাধিক গ্রামে বৈষ্ণবমেলা দেখা যায়।বৃহত্তর কাটোয়া অঞ্চল ধরলে এই মেলার সংখ্যা বৃদ্ধি বিস্ময়কর।কারন অনুসন্ধান করেছেন –স্বপনকুমার ঠাকুর।

বৈষ্ণবধাম কাটোয়া

মহাপ্রভু কাটোয়ায় ১৫১০ খ্রিষ্টাব্দে কেশবভারতীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন।তারপর থেকে কাটোয়াকে কেন্দ্র করে রাঢ়-অঞ্চলে যেন গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্লাবন বয়ে যায়।অধিকাংশ বৈষ্ণবপদকর্তা,চৈতন্যজীবনীকার যেমন এতদ অঞ্চলের ভূমিপুত্র ছিলেন তেমনি প্রথম দুটি বৈষ্ণব মহাসন্মেলন যথা দাস গদাধর ঠাকুর ও নরহরি সরকারের প্রয়াণ উৎসব কাটোয়া ও শ্রীখণ্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।একাধিক বৈষ্ণব পাটবাড়ি,নিত্যানন্দের গোপালদের কর্মভূমি,রেনেটি ও মনোহরশাহী কীর্তনের চর্চা এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই বিকশিত হয়।সর্বোপরি কাটোয়া হয়ে ওঠে মহাপ্রভুর সন্ন্যাস তীর্থ।ফলত, কণ্টকনগর বা কাটোয়া বৈষ্ণব শ্রীধামে পরিণত হয়।এই কারণে সপ্তদশ শতকের পদকর্তা গোপালদাস লিখেছিলেন-


শ্রীবৃন্দাবন মথুরা দ্বারকা নীলাচল।
নবদ্বীপ খড়দহ শান্তিপুর স্থল।।
কণ্টকনগর লইঞা অষ্টকৃষ্ণ চৈতন্যের ধাম।।

কাটোয়া অঞ্চলে বৈষ্ণবমেলা

এ হেন কাটোয়ায় যে বৈষ্ণবমেলার আধিক্য থাকবে তাতে আর সন্দেহ কোথায়। তবে কেন এমনটি হলো–এক কথায় উত্তর দেওয়া সহজ নয়। অনুমিত হয়- কাটোয়ার বিশেষ ভোগৌলিক সংস্থান,উচ্চবর্ণের বসতি,প্রাকচৈতন্য আমলের অন্তর্লীন বৈষ্ণবসংস্কৃতি এবং বাংলার রাজধানী গৌড় বা মুর্শিদাবাদের নৈকট্য সর্বোপরি সুসমৃদ্ধ কৃষি ও কুটীরশিল্পের বিকাশের জন্য অঞ্চলটি চৈতন্য রেনেশাঁসের অন্যতম পীঠস্থানে পরিণত হয়।

 নানা ধরনের মেলা

প্রস্তুত আলোচনা মেলা নিয়ে। কাটোয়া অঞ্চলে নানা ধরনের মেলা রয়েছে যেমন লোকদেবদেবীর মেলা, চড়কের মেলা,পিরের মেলা ইত্যাদি।তবে বৈষ্ণব মেলাই এখানে ধারে ও ভারে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ও লোকসমাদৃত ।অধিকাংশ বৈষ্ণব মেলা আবার বৈষ্ণব পদকর্তা বা মহাজনদের তিরোভাব তিথি উপলক্ষে আয়োজিত মিলনমেলা।একটা বিষয় লক্ষ করার মতো–এখানে বৈষ্ণব মহাজনদের আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে মেলা না থাকলেও তিরোভাব তিথিতে মেলা বসে।মেলায় প্রথম দিন চিঁড়া মহোৎসব,দ্বিতীয় দিন অন্ন মহোৎসব এবং তৃতীয় দিন চলে ধুলোট।

কাটোয়ায় বৈষ্ণবমেলার আধিক্যের কারণ

বোঝাই যায় মেলার এই বিন্যাসটি এসেছে মহাপ্রভু কর্তৃক যবন হরিদাসের প্রয়াণ মহোৎসব পালনের ঘটনাটিকে অনুসরণ করে।মেলাগুলিতে কীর্তনগান,গৌর নিতাইর দারু পুতুলের পশরা, তুলুসির মালা একধরনের লম্বা রসগোল্লা লোকমুখে যার পরিচিতি নোড়ামিস্টি সাবেকি ঐতিহ্যের অঙ্গ। সঙ্গে অগণিত সাধারণ ভক্ত তথা বাউল ফকির সহজিয়া বৈষ্ণবদের সমাগম দেখার মতো বিষয়।তবে কাটোয়া বৈষ্ণবধাম হলেও শহরে কোন বৈষ্ণবমেলা নেই।আর এর থেকে সহজেই অনুমান করা যায় মেলাগুলি খুব বেশি হলে সপ্তদশ বা অষ্টাদশ শতকে শুরু হয়েছিল স্থানীয় জমিদার বণিক ও ধনাঢ্য ভক্তদের পৃষ্ঠপোষকতায়।

অগ্রদ্বীপের মেলা

কিন্তু কাটোয়া অঞ্চলে এমন তিনটি বৈষ্ণব মেলা রয়েছে যা আদিতে ছিল অন্য ধরনের মেলা।পরে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম তাকে য়আত্মীকরণকরে নিয়েছে নিজস্ব আঙ্গিকে ।মেলা তিনটি হলো উদ্ধারণপুরের উত্তরান্তির মেলা।অগ্রদ্বীপের বারুণিমেলা এবং রামায়েত বৈষ্ণবদের দধিয়া বৈরাগ্যতলার মেলা। এর মধ্যে উদ্ধারণপুর ও অগ্রদ্বীপের মেলা দুটি সুপ্রাচীন। এ দুটি গঙ্গাস্নানের মেলা।অগ্রদ্বীপ প্রাচীন ঐতিয্যবাহী জনপদ। এখানকার বারুণি স্নান উপলক্ষে চৈত্রমাসে লক্ষাধিক জনসমাগমের কথা জানা যায় উনিশ শতকের সমাচার দর্পণ পত্রিকায়।বারুণি উপলক্ষে অগ্রদ্বীপে হাজির হতো বাংলাসহ অন্যন্য প্রদেশ থেকে পুণ্যকামী ভক্তজন।মায়েরা আসতেন গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন দিতে।পরে কুলাই গ্রামের গোবিন্দ ঘোষের শ্রীপাটে পরিণত হয় অগ্রদ্বীপ।আর এই সূত্রে গোবিন্দ ঘোষের তিরোভাব তিথি পালিত হতে থাকে বারুণিমেলার দিনটিতে। ধর্মীয় স্নানের মেলা হয়ে ওঠে বৈষ্ণবীয় মেলা।কেতুগ্রামের উধানপুর ছিল নৈহাটি মৌজার অন্তর্গত শবদাহের ঘাট।

উদ্ধারণ দত্তের বৈষ্ণবমেলা

উধান শব্দটির আদি অর্থ শবদাদের চুল্লি।নিত্যানন্দের শিষ্য উদ্ধারণ দত্ত সপ্তগামের বিখ্যাত বণিক হলেও তাঁর কর্মভূমি ছিল এই উধানপুর।উধানপুর ক্রমশ উদ্ধারণ দত্তের নাম সাদৃশ্যে উদ্ধারণপুর হয়ে ওঠে।একইভাবে অগ্রদ্বীপের মতো উদ্ধারণপুরের উত্তরান্তির স্নানের মেলা উদ্ধারণ দত্তের তিরোভাব মেলায় পর্যবসিত হয়ে যায়।দুটি মেলার আশ্চর্য সাদৃশ্য রয়েছে।অগ্রদ্বীপে ঘোষ ঠাকুরের শ্রাদ্ধক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয় আরাধ্য গোপীনাথের মধ্য দিয়ে আর উদ্ধারণ দত্তের শ্রাদ্ধক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয় আরাধ্য বলরাম বিগ্রহের মধ্যস্থতায়।

আরও পড়ুন-বিলুপ্ত প্রায় জন্তু জানোয়ার আজও টিকে আছে রাঢ়ের লোকসংস্কৃতিতে

বৈরাগ্যতলার রামায়েত বৈষ্ণবমেলা

অন্যদিকে অষ্টাদশ শতকের গোপালদাসের আরাধ্য রঘুনাথ বিগ্রহের প্রতিষ্ঠার দিন থেকে শুরু হয় বিখ্যাত দধিয়া বৈরাগ্যতলার মেলা। ক্ষেত্রসমীক্ষাসূত্রে জানা যায় গোপালদাস ছিলেন কনৌজের বাসিন্দা।তিনি রামায়েত সাধক ছিলেন।তাঁর আরাধ্য দেবতা হলেন রঘুনাথ ।এই রঘুনাথ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার সূত্রে পরবর্তীকালে মেলা জমে ওঠে।বাংলার সহজিয়া বৈষ্ণবসাধনার ধারায় রামায়েত গোপালদাস দাস ক্রমশ মিশে যান।কিন্তু কি আশ্চর্য–প্রতিষ্ঠা বিগ্রহের দিনটি বৈষ্ণবধারায় গোপালদাসের চিঁড়া মহোৎসবে পরিণত হয়েছে।

মেলা নিয়ে কৌলালের তথ্যচিত্র দেখুন


Share your experience
  • 181
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    181
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ড.স্বপনকুমার ঠাকুর

DR. SWAPAN KUMAR THAKUR
লেখক-গবেষক ও অভিজ্ঞ ক্ষেত্রসমীক্ষক। কৌলাল অনলাইন ওয়েবসাইট ও প্রিন্ট কৌলাল পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। ড. ঠাকুর পেশায় শিক্ষক। প্রিয় বিষয় রাঢ়-বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি । বিবিধ পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।রচনা করেছেন ১৫টি বই ;বাঙ্গলার ইতিহাসে কাটোয়া,ইন্দ্রাণীর ইতিকথা, রাঢ় কথাঃমননে ও সমীক্ষণে,বঙ্গে বর্গিহাঙ্গামা ইতিহাস ও কিংবদন্তী,বাংলার মুখ,বাংলার লোক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি, রাঢ় বাংলার কবিগান,বাংলার কৃষিকাজ ও কৃষিদেবতা ইত্যাদি। পুরষ্কার ও সংবর্ধনা পেয়েছেন একাধিক সারস্বত প্রতিষ্ঠান থেকে যেমন কলকাতা প্রণয়-স্মারক পুরষ্কার, নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদ,কলিকাতা লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র থেকে পেয়েছেন সারস্বত সন্মাননা।