বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো এবং শিল্পী সম্প্রদায়ের কথা

Share your experience
  • 147
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    147
    Shares

বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো এবং শিল্পী সম্প্রদায়ের কথা।ভাদ্র সংক্রান্তির দিনে হয় সমস্থ রকম নির্মাণ শিল্পের দেবতা দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার পুজো। এনার উৎপত্তি নিয়ে অনেক মত প্রচলিত। কেউ বলেন ব্রহ্মার নাভি পদ্ম থেকে তাঁর উৎপত্তি, আবার আরেক মত হচ্ছে অষ্ট বসুর প্রভাস হচ্ছেন তাঁর পিতা এবং মাতা হচ্ছেন দেবগুরু বৃহস্পতির বোন যোগসিদ্ধা। লিখছেন–ডা.তিলক পুরকায়স্থ।

বিশ্বকর্মা
 দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা

বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো–দেবতার পরিচয়

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের দশম অধ্যায়ে দেখা যায় যে, দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা কোন দেবীকে বিবাহ না করে অপ্সরা ঘৃতাচীকে বিবাহ করেন এবং তাঁর নয়টি পুত্র সন্তান হয়। এখানে বলা হচ্ছে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং তাঁর অভিশাপে স্বর্গের অপ্সরা ঘৃতাচী মর্ত্যলোকে মন্মথ নামক গোয়ালার কন্যা হয়ে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর নাম হয় প্রভাতী। এবং বিশ্বকর্মা এঁকেই বিবাহ করেন। এঁদের বিবাহজাত নয়টি শিল্পী সম্প্রদায়ের নামগুলি হচ্ছে এরূপ-

বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো–শিল্পী পরিচয়

মালাকার, কর্মকার, শাঁখারি বা শঙ্খকার,তন্তুবায়, কুম্ভকার ,কাংশকার, সূত্রধর, চিত্রকর এবং স্বর্ণকার। তাই এই নয়টি শ্রেণীর বিভিন্ন প্রকার শিল্পকর্মের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির কাছেই বিশ্বকর্মা পুজো হচ্ছে সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান।অতিশয় দুঃখজনক হলেও নির্মম ভাবে সত্য যে, একসময়ের ব্রাহ্মণ‍্যবাদী হিন্দু সমাজে চিত্রাঙ্কন, নৃত্যগীত এবং নটশাস্ত্রের চর্চা করা অপরাধ বলে গণ্য করা হত। মেয়েদের এসব চর্চা তো পতিতা বৃত্তির সমান বলে ভাবা হত। পুরুষ শিল্পীদেরও অত্যন্ত নিচু চোখে গণ্য করা হত এবং তাঁদের সমাজের অত্যন্ত নিম্ন স্তরে বাস করতে বাধ্য করা হত। কোন একটি উদ্ভট ঘটনা জুড়ে দিয়ে ব্রাহ্মণ‍্যবাদী হিন্দু সমাজ, সেযুগে শিল্প কলা চর্চা করা চিত্রকর বা পটুয়াদের কিম্বা ডোকরা ধাতু শিল্পের চর্চা করা ডোকরা কামার সম্প্রদায়ের মানুষগুলোকে সমাজচুত্য এবং অন্তজ করে রেখেছিল।

পটুয়াদের সমাজচুত্যের পিছনে যে কারণটি আছে সেটি হচ্ছে তাঁদের কোন এক পূর্ব পুরুষ নাকি তন্ময় হয়ে মহাদেবের ছবি এঁকেছিলেন মহাদেবকে না জানিয়ে।ছবি আঁকা শেষ হলে পটুয়া দেখেন যে, সামনে স্বয়ং মহাদেব দাঁড়িয়ে আছেন। ভয়ের চোটে শিল্পী আঁকার তুলির দিকটা মুখে পুরে লুকিয়ে ফেলেন। এতে নাকি ক্রুদ্ধ হয়ে মহাদেব অভিশাপ দেন – পটুয়ারা না হিন্দু না মুসলমান হয়ে থাকবে, মুসলমানের রীত আর হিন্দুর কর্ম করে খাবে। বুঝুন ঠ্যালা- সাত পাঁচে না থাকা ভোলে বাবা তো হিরণ্যকশিপু, রাবন এরকম সব অসুরদের অবধি বরদান করেন।

বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো–পটুয়া

আর স্রেফ না বলে উনার ছবি আঁকার জন্য আর ভয় পেয়ে আঁকার তুলি মুখের মধ্যে লুকোবার চেষ্টা করার জন্য পুরো শিল্পী সম্প্রদায়ের জাত মেরে দিয়ে আধা মুসলমান হবার অভিশাপ দিয়ে দিলেন, একথা কি মানা যায় ! সত্যি কথা বললে, শিব ঠাকুর তো আদিতে অনার্যদের পূজিত দেবতা ছিলেন।ব্রাহ্মণ‍্যবাদী হিন্দু সমাজ অনেক পরে উনাকে বৈদিক দেবতার স্তরে উন্নীত করে। সেই শিব ঠাকুর কয়েকটি গরিব শিল্পী মানুষকে অভিশাপ দিচ্ছেন- তোরা আদ্ধেক মুসলমান হবি, এটা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য ? আসল কথাটি হচ্ছে এই জাত শিল্পীদের, ভালো করে বললে, এঁদের হাতের রংতুলি দিয়ে আঁকা ছবিগুলোকে ব্রাহ্মনবাদী সমাজ ভয় পেত, বলা তো যায়না, এই নিজেদের চালে চলা গরিব মানুষগুলি কোনদিন ছবি এঁকে সমাজের নচ্ছামিকে টেনে রাস্তায় নামিয়ে দেবেনা, তার কি মানে আছে। তাই দাও সমস্ত শিল্পী জাতটিকেই পতিত করে-
“ব্যাতিক্রমেণ চিত্রণাং সদ্যশিচত্রকরস্তথা ।
পতিত ব্রহ্মশাপেন ব্রাহ্মণানাঞ্চ কোপত: ।”

বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো–বিশ্বকর্মা পুরাণে সাহিত্যে

আজকে ভারতবর্ষের বিজ্ঞানীরা চাঁদ ছাড়িয়ে মঙ্গলগ্রহে অভিযান করছে। কিন্তু এই গরীব মানুষগুলির উপরে শিব ঠাকুরের অভিশাপ এখনও বলবৎ। সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ।এখানে প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখি যে ভারতবর্ষের এক বিরাট সংখ্যক দলিত সম্প্রদায়ের নাম বিশ্বকর্মা। এই সম্প্রদায়ের প্রতিটি ব্যক্তির অন্ত পদে থাকে বিশ্বকর্মা নাম এবং এঁরা মনে করেন বিশ্বকর্মা পিছিয়ে পড়া দলিতদের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, আদিম পুরুষ, যিনি নিজ কর্মফল ও অসাধারণ প্রতিভার দ্বারা স্বর্গের দেবসভা, কুবেরের বাসস্থান, রাবনের সোনার লঙ্কা, শ্রী কৃষ্ণের দ্বারকা, শিবের হরধনু, ইন্দ্রপ্রস্ত, হস্তিনাপুর , পুরীর মন্দির, পুষ্পক বিমান ইত্যাদি নির্মাণ করেছেন।

রামায়ণের আদিকাণ্ডে পাচ্ছি বিশ্বকর্মা দুটি বিশাল ধনুক নির্মাণ করেছিলেন। একটি শিবের জন্য, এটিই হচ্ছে হরধনু, সীতার স্বয়ংবর সভায় এটিকেই রাখা হয়েছিল। অন্যটি বিষ্ণুর জন্য যেটি পরে পরশুরামের কাঁধে থাকত এবং পরে এটিতে জ্যা আরোপ করে রামচন্দ্র, পরশুরামের দর্প চূর্ণ করেন। শুধু এই ধনুক দুটিই নয়, বলা হয় বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, দেবসেনাপতি কার্তিক সহ সমস্থ দেবতাদের বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র মায় শিবের ত্রিশূল অবধি বিশ্বকর্মা নির্মাণ করেন। তাঁকে এ ব্যাপারে সাহায্য করেন তাঁর কন্যা সংজ্ঞা। কিভাবে ?

 বিশ্বকর্মার পরিচয়

বিশ্বকর্মা মেয়ের বিয়ে দেন সূর্যদেবের সঙ্গে। সূর্যের প্রখর তেজ সহ্য না করতে পেরে সংজ্ঞা, শানচক্রে সূর্যের তেজের এক-অষ্টমাংশ কেটে ফেলেন। এই তেজস্ক্রিয় অংশটি দিয়েই নাকি বিশ্বকর্মা সব দেবতাদের অস্ত্র নির্মাণ করেন।
আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে বিশ্বকর্মা আদতে দলিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ছাড়া আর কিছু হতে পারেন না।
বিশ্বকর্মা যদি ব্রাহ্মণ হতেন, তাহলে কি তাঁর শিল্পী পুত্রদের ব্রাহ্মণরা এভাবে জাতি চুত্য করতে পারেন ? ব্রাহ্মণ বলে গ্রহণ করা তো দূরের কথা, সমাজের উচ্চস্তরেও স্থান দেওয়া হয়নি তাঁদের ।

পুরাণ সাহিত্যে বিশ্বকর্মা

আবার বায়ু পুরান এবং পদ্ম পুরানে দেখছি বিশ্বকর্মার সঙ্গে নাকি ভক্ত প্ৰল্লাদের কন্যা বিরোচনার বিবাহ হয়, এঁদের পুত্র হচ্ছেন আরেক অসাধারণ শিল্পী ময় দানব।সারা বিশ্ব জুড়েই দেবশিল্পীর কর্মকান্ড ছড়িয়ে রয়েছে, তাই তিনি বিশ্বকর্মা। তবে বর্তমানে বিভিন্ন শহর ও শহরতলিতে তাঁকে বিভিন্ন কল-কারখানায় নির্মাণশিল্প এবং যন্ত্রপাতির দেবতা রূপেই পুজো করা হয়। তাঁর বাহন হচ্ছে হস্তী এবং তাঁর পূজিত মূর্তির হাতে বিভিন্ন শিল্প নির্মাণের সামগ্রী যেমন ছেনি, হাতুড়ি, কুঠার এবং নিক্তি বা দাঁড়িপাল্লা থাকে, যার অর্থ সম্ভবত জীবনের চলার পথে কর্ম ও জ্ঞানের সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে বোঝায় । তবে বাংলাদেশে বর্তমানে পূজিত বিশ্বকর্মা মূর্তির সঙ্গে উত্তরভারতে পূজিত বিশ্বকর্মা মূর্তির কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। উত্তরভারতে ইনার প্রাজ্ঞ, বয়ষ্ক মূর্তি পুজো করা হয়, সেখানে তিনি হংসারূঢ়।

বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো

এবারে আসি বিশ্বকর্মা পুজোতে ঘুড়ি ওড়ানোর কথায়। বাংলার কোথাও কোথাও পৌষসংক্রান্তিতে ঘুড়ি ওড়াবার চল থাকলেও সাধারণত বিশ্বকর্মা পুজোতেই ঘুড়ি ওড়ান হয়। বাংলায় ঘুড়ি ওড়ান আর ভোঁকাট্টা শব্দটি প্রায় সমার্থক। তাই বাংলা জনপ্রিয় গানেও ভোঁকাট্টা শব্দ বারে বারে ফিরে আসে।

বাঙালি থাকবে, ঘুড়ি ওড়ানো থাকবে আর মারপিট, লাঠালাঠি, পলিটিক্স থাকবেনা, সে আবার হয়নাকি ! রবি ঠাকুরের সময়েও এসব হত, বিশ্বাস হচ্ছেনা বুঝি, চলুন ঝিনেদার জমিদার কালাচাঁদ রায়ের বাড়িতে- “তিন দিন ধরে নাকি দুই দলে পড়াদয়/ ঘুড়ি-কাটাকাটি নিয়ে মাথা ফাটাফাটি হয়।/ কেউ বলে ঘুড়ি নয়, মনে হয় সন্ধ/ পলিটিকালের যেন পাওয়া যায় গন্ধ।’

ঘুড়ির প্রদর্শনী
ঘুড়ির প্রদর্শনী

বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো–ঘুড়ি তৈরি

আমাদের ছেলেবেলায় , শহুরে ছেলেরা দোকান থেকে কেনা ঘুড়ি ওড়াতেন। গাঁয়ের ছেলেরা কিন্তু খবরের কাগজ, শিরিষের আঠা ও বাঁশের ছোট কঞ্চি জুড়ে ঘুড়ি নিজেরাই তৈরি করে নিত। দুটি বাঁশের কঞ্চির সিধেটাকে বলত শলা আর ধনুকের মতন বাঁকা অংশটির নাম পটি বা খিল। ঘুড়িতে একটি ছোট তিনকোনা লেজ থাকত, তবুও এর সঙ্গে এক ইঞ্চির মতন চওড়া , বেশ খানিকটা লম্বা আরেকটি লম্বা লেজ জুড়ে দেওয়া হত। শলা-পটির জোড়ে একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র এবং ল্যাজের কিছু উপরে আরেকটি ছিদ্র করে একটি সুতো বেঁধে সুতোর মাঝখান ধরে ঝুলিয়ে দিয়ে পরখ করা হত- ঘুড়িটি মাটির সমতলে ঝুলছে, না কোন দিকে হেলে গ্যাছে। সমতলে না ঝুললে আকাশে ঘুড়ি গোত্তা খেতে থাকবে। যদি কোন দিকে হেলে থাকত তবে বিপরীত দিকে পটির গায়ে কিছু কাগজ জড়িয়ে ব্যালান্স করা হতো, যাকে বলা হত কার্ণি বা কান্নিক দেওয়া।

ব্যাস এবারে লাটাইয়ের সুতোর সঙ্গে বেঁধে ঘুড়ি ওড়ান। তবে বুড়ো আঙুল আর কড়ে আঙ্গুলে সুতো গোটান ছিল ঘুড়ি শেখার সবচেয়ে কষ্টকর অধ্যায়।ঘুড়িকে কিন্তু ওড়াতে হয় বাতাসের বিপরীতে, বাতাসের অভিমুখ আর লাটাইয়ের সুতোর টান, দুই বিপরীতমুখী টানের ভারসাম্য ঘুড়িকে ভাসিয়ে রাখে।

বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো–মাঞ্জা

আর ভোকাট্টার জন্য হামামদিস্তায় করা হত কাঁচ গুঁড়ো যাকে বলা হত চুর। সাবু দানা, শিরীষ আঠা এবং ভাতের মাড় গরম করে হত লেই, সেই লেইয়ের মধ্যে রং মিশিয়ে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখা হত ঘুড়ির সুতো। তারপর একজন দুটো গাছের গোড়ায়, সুতো টানতে টানতে গোল গোল করে ঘুরছে, আর টেনিয়া চলেছে পিছন পিছন হাতভর্তি চুর নিয়ে আঠাল সুতোর উপরে টানতে টানতে। এবারে শুকিয়ে গেলেই মাঞ্জা তৈরি।

তখনকার খানদানী ঘুড়ির কত নাম। উপর-নীচে আলাদা রঙের কাগজ- পেটকাটি, শলার উপরের দিকে অর্থাৎ মুখের দিকে রং আলাদা – মুখপোড়া, ঘুড়ির বুকে একটুকরো সাদা রঙের কাগজ- চাঁদিয়াল এরকম আরো কত কিছু। রামদুলাল দের পুত্র প্রমথনাথ, ঘুড়ি লাটাইয়ে সেযুগের শেষ কথা, লাটাই থেকে হয়ে গেলেন লাটু বাবু।

সেসব প্রায় ইতিহাস। আজকাল ঘুড়ি তৈরি হয় সেলোফেন কাগজে, তাতে ছাপা থাকে বার্বি গার্ল থেকে ছোটা ভীম, হনুমান, ডোরেমন ইত্যাদি। জয়পুরে ঘুড়ি তৈরি করার বিশাল পট্টি আছে মতি দুংরিতে , ওখানে মোহাম্মদ জহুরুল প্রতিষ্ঠিত” লালা ভাই পতঙ্গ বালে” দোকানে গিয়ে আলাপ হল বর্তমান প্রজন্মের মালিক মোহাম্মদ মিরানের সঙ্গে, দোকান চালাতে সাহায্য করে উনার দুই ছোট ভাই ইরফান ও আশরাফ।ওখানে গিয়ে জানলাম যে সবচেয়ে ছোট ঘুড়িকে বলে হাফ সেল, আর সবচেয়ে বড় সাইজ ২ সেল।

যদিও এখানে উনারা খুচরো বিক্রি করেন না, পাইকারি রেটে ছোট ঘুড়ির দাম পরে ৫ টাকা প্রতিটি আর বড় ঘুড়ি ৩০ টাকা প্রতিটি। তবে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে কাঁচ গুঁড়ো দেওয়া মাঞ্জা সম্পূর্ণ বেআইনি। কেবলমাত্র নাইলন আর প্লাস্টিক সুতো ব্যবহার হয়। কিন্তু মিরানের কাছে শুনলাম গ্রামে গঞ্জে এখনও উনারা সুতোর উপরে চালের মন্ড দিয়ে তৈরি মাঞ্জা বিক্রি করেন। এক রিল ভর্তি সুতোর মাঞ্জা বা চরকার দাম পরে ২০০ টাকা, সেখানে নাইলন মাঞ্জা পরে ৮০০ টাকা।
আর লাটাইয়ের হ্যান্ডেল দুটি কাঠের হলেও, বডি কিন্তু প্লাস্টিকের হয়ে গ্যাছে

ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিশেষ করে উত্তর পশ্চিম ভারত ও দাক্ষিণাত্যে পৌষ সংক্রান্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ঘুড়ি ওড়ান।
জয়পুরে সংক্রান্তির দিনে জল-মহলে তিন দিনের পতঙ্গ ওড়াবার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও ১৫ ই আগস্টে একই ধরণের অনুষ্ঠান হয়।

কাগজের ছোট ঘুড়ির বদলে আজকাল নাইলনের ঘুড়ির প্রচলন হয়েছে। চীন দেশে তো বহুকাল আগে থেকেই সিল্কের ঘুড়ি ওড়ান হত। নাইলনের ঘুড়ি অতিশয় টেঁঁকসই , জলে ভিজলে কিছু হয়না, দেখতেও চমৎকার। তাই আজকের আধুনিক ঘুড়ি হচ্ছে মাছ ঘুড়ি, ঈগল ঘুড়ি, প্রজাপতি ঘুড়ি, টিকটিকি, গিরগিটি, সাপ, ব্যাঙ, মায় হলিউড হিরো হিরোইনদেরও আকাশে উড়তে দেখবেন।

বিশ্বকর্মাপুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো–ঘুড়ির আবিষ্কার

সর্বপ্রথম ঘুড়ির প্রচলন কোথায় হয় এই নিয়ে জোর টক্কর চীন আর গ্রিসের মধ্যে। চীনের একটি প্রাচীন লোককথায় আছে, এক চাষীর মাথার টোকা বার বার হাওয়ায় উড়ে যাওয়াতে, চাষি এক টুকরো দড়ি দিয়ে টোকার মাথায় বেঁধে দেন, এতে হল কি, হাওয়াতে টোকা মাটিতে না পড়ে উড়তে থাকে। সেই দেখে গ্রামের লোকেদের মাথায় ঘুড়ির আইডিয়া আসে। তবে সরকারী ভাষ্যে চীনারা বলে – যীশু খ্রিস্টর জন্মের ২০০ বছর আগে হ্যান সম্রাট হান-সিন প্রথম ঘুড়ি ওড়ান, ওয়ে ফ্যাং শহরে। এই ঘটনার স্মরণে ওয়ে ফ্যাং শহরে চীনা সরকার একটি আস্ত ঘুড়ির মিউজিয়াম বানিয়ে ফেলেছে। আবার ওয়ার্ল্ড কাইট ফেডারেশনের প্রধান কার্যালয় এখানেই।

চীনাদের তৃতীয় দাবি হচ্ছে, ওঁরা যুদ্ধের সময় মু ইউয়ান বলে একরকম কাঠের ঘুড়ির সঙ্গে বিস্ফোরক বেঁধে দিতেন, সেই বিস্ফোরক বয়ে নিয়ে যাওয়া ঘুড়ি শত্রু শিবিরে গিয়ে আছড়ে পড়তো।আবার গ্রীসের দাবি তাঁদের এক বিজ্ঞানী ট্যারাস্তাস শহরে খ্রিস্ট জন্মের ৪০০ বছর আগেই নাকি কোন একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে গিয়ে প্রথম ঘুড়ি আকাশে উড়িয়েছিলেন। বিজ্ঞানীর নাম তারা বলেন- আর্কিটাস।

মনে পড়ল আরেক বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের কথা। তাঁর ঘুড়ির সুতোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের কথা তো মিথ।
সেদিন ডঃ স্বপন কুমার গোস্বামীর একটি লেখা থেকে জানলাম, সবচেয়ে উঁচুতে ঘুড়ি ওড়ানোর রেকর্ড নাকি হচ্ছে ১৬০০৯ ফুট, চারজন অস্ট্রেলিয়ান ১১ মিঃ × ১১ মিঃ এক বিশাল ঘুড়ি উড়িয়ে এই রেকর্ড করেন ২০১৪ সালের ২৩ শে সেপ্টেম্বর। তারিখটা দেখুন, বিশ্বকর্মা পুজোর ধারে কাছেই কিন্তু ওঁরাও ঘুড়ি উড়িয়েছিলেন। জয় বাবা বিশ্বকর্মার জয়।

ওয়ার্ল্ড কাইট ফেডারেশন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আন্তর্জাতিক ঘুড়ি ওড়াবার প্রতিযোগিতা করে থাকে। মকর সংক্রান্তির পুণ্য লগ্নে আহমেদাবাদ এবং হায়দরাবাদ শহরেও প্রতি বছর এই আন্তর্জাতিক খেলার আসর বসে । হায়দরাবাদ শহরের ঘুড়ি উৎসবের কথা বলি- ভোকাট্টা নয়, দেশ বিদেশের রঙ বেরঙের ঘুড়ি ওড়ানো দেখতে লক্ষ লক্ষ লোক ভেঙে পড়ে সেকেন্দ্রাবাদের প্যারেড গ্রাউন্ডে।

এবছর ভারত বাদে আরো ২০ টি দেশ থেকে ৬০ জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্লায়ারের সঙ্গে ভারতের ১০০ জন বিখ্যাত ফ্লায়ার অংশগ্রহণ করেন।এসব আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ছোট্ট ঘুড়ি হারিয়ে গেছে। সবই জাম্বো সাইজের, ভারতীয় ঘুড়ির কথাই বলি- এক বিশাল গড়ুর দেব তাঁর বিরাট ডানা মেলে আকাশে উড়ছেন কিম্বা ম্যাঙ্গালোর থেকে আসা দলের সুতোর টানে বিশাল বীর হনুমানজী উড়ে গেলেন আকাশপানে- খুশীতে ফেটে পড়ল উপস্থিত জনতা। আরেকটি কথা, এখন জাম্বো ঘুড়ির ক্ষেত্রে কেবলমাত্র একজন ঘুড়ি ওড়ায় না, পুরো টিমের সবাইয়ের হাতে থাকে সুতো, অসাধারণ সিংক্রোনাইজ পারফরম্যান্স, না দেখলে বিশ্বাস হবে না।

আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উৎসবে

প্রতি বছর এই আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উৎসবের একটি থিম থাকে। ২০২০ র থিম- ” একটি মেয়েকে শিক্ষিত করে তুলুন, সেই বদলে দেবে গোটা পৃথিবী” ।শুধু ঘুড়ি ওড়ানোই নয়, সঙ্গে থাকে ঘুড়ি নিয়ে ওয়ার্কশপ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
এবারের (পৌষ সংক্রান্তি বা পোঙ্গল- ১৫ ই জানুয়ারি, ২০২০) ঘুড়ি উৎসবের কিছু মজাদার ঘটনা বলি। হায়দরাবাদ শহরের একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী এসেছিলেন, তাঁর তৈরি সোনার ঘুড়ি নিয়ে। ভেবে দেখুন কি সাঙ্ঘাতিক ক্রেজ রয়েছে এই আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উৎসব নিয়ে। গত বছর তিনদিনে ১২ লক্ষ দর্শক এসেছিলেন, ঘুড়ি ওড়ান দেখতে, এবারে উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস, এই সংখ্যাটি ১৫ লক্ষ হবে।

ঘুড়ির বৈচিত্র্য
ঘুড়ির বৈচিত্র্য

 ঘুড়ির বৈচিত্র্য

এই ঘুড়ি উৎসবের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রাতের বেলা এল ই ডি ঘুড়ি ওড়ান উৎসব। যদিও রাতের উৎসব দেখার সৌভাগ্য হয়নি, তবে তৃতীয় দিনের, দিনের বেলাতেই যা দেখা গেছে, মাথা খারাপ হবার জোগাড়।নীল আকাশের বিশাল চাঁদোয়া জুড়ে বিশাল বিশাল বিশাল ভিন্ন গ্রহের জীবেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার মধ্যে আবার সামুদ্রিক জীবেরাও জল ছেড়ে, নভচর হয়ে গেছে। হটাৎ দেখি একদম আমার মেয়ের ব্যাগের ছাতাটা, আরো বড় হয়ে গিয়ে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। আর পাশে একটা হাওড়া ষ্টেশনের মতন বিরাট পাখা, বন বন করে ঘুরছে। পাখা ঘুড়ির কথা কস্মিনকালেও শুনিনি বা দেখিনি। পাখাটাই বা ঘুড়তে ঘুড়তে কিভাবে উড়ছে, মুখ থুবড়ে পড়ছেনা না কেন, কিছুই বুঝতে পারছি না।

 আরও পড়ুন মুক্তাই চন্ডী মাতা – পশ্চিম বর্ধমানের এক জনপ্রিয় লৌকিক দেবী

ওরে বাবা ! এটা কি রে ? একটা বিশাল টিকটিকির মতন জীব এগিয়ে আসছে তো, এদিক পানেই। চীনা ঘুড়ি শুনে ভেবেছিলাম ড্রাগন হবে, কিন্তু পরে বোঝা গেল এই জীবটিকে ডুয়ার্সের জঙ্গলে প্রায়ই দেখা যায়- গেকো।কিন্তু বিস্ময়ের তখনও অনেক বাকী। এক ঝটকায় পৌঁছে গেলাম রূপকথার জগতে। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, ধবধবে সাদা পক্ষীরাজ ঘোড়াকে উড়ে বেড়াতে, খুর চারটি তার আবার টুকটুকে গোলাপি। কি সুন্দর যে লাগছিল উড়ন্ত পক্ষীরাজ কে দেখতে কি বলব ! উৎসবে উপস্থিত ৫০ ঊর্ধের বয়স্কদের হাত-তালি ও মুখের অভিব্যক্তি বুঝিয়ে দিচ্ছিল- তাঁরা ফিরে গেছেন তাঁদের কৈশোরে। সেই গাঁয়ের মাঠে, নদীর ধারে লাটাই আর ঘুড়ি নিয়ে দৌড়াবার দিনগুলিতে।

ভোঁকাট্টা দেখতে এসে, রূপকথার জগৎকে ফিরে দেখা- এই বা কি কম প্রাপ্তি !

ছবি:– সুমন মুখার্জি, তুলিকা পুরকায়স্থ।

তথ্যসূত্র:-
১) http://incepnow.com/international-kite-and-sweet-festival-kicks-off-adding-magic-to-sky/২) Times of India ·
Go fly a kite! Parade Ground is where the biggest patang party is on this Sankranthi

৩) https://www.newindianexpress.com › …Web results
Hyderabadis revel in kite flying and sugar rush during Sankranti- The New Indian …

৪) দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা, কৃষ্ণকমল। sanatandharmatattva.wordpress

 দেখুন কৌলালের মহালয়া


Share your experience
  • 147
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    147
    Shares

Facebook Comments

Post Author: ডা. তিলক পুরকায়স্থ

Tilak Purakayastha
2/3, CENTRAL HOSPITAL KALLA, ASANSOL 713340. কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের MBBS, MD, মুখ্যত চিকিৎসক| কেন্দ্রীয় সংস্থার উৎকৃষ্ট চিকিৎসা সেবা পদক, লাইফ টাইম আচিভমেন্ট আওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পুরস্কারে পুরস্কৃত। নেশায় ভ্রামনিক , ফটোগ্রাফার এবং শখের লেখক।