ভূকৈলাশ রাজবাড়ি ও খিদিরপুর শিবমন্দির

Share your experience
  • 287
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    287
    Shares

সায়ন দাস

 কলকাতার প্রাচীন ও সম্ভ্রান্ত রাজবংশদের মধ্যে ভূকৈলাশ রাজবংশ অন্যতম। এই প্রাচীন ও সম্ভ্রান্ত রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল প্রচুর ধনশালী ছিলেন। ইনি ধনশালী ব্রাক্ষ্মণ কন্দর্প ঘোষালের পৌত্র। তিনি প্রাচীন গোবিন্দপুর গ্রামে বাস করতেন। গোবিন্দপুর গ্ৰামটি যখন কোম্পানি বাহাদুর  দুর্গ নির্মাণের জন্য অধিকার করেন, তখন তিনি খিদিরপুরে উঠে যান। তাঁর দুই পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষাল ও গোকুলচন্দ্র ঘোষাল। গোকুলচন্দ্র ঘোষাল বাংলার বাঙলার শাসনকর্তা মিঃ ভেরেলস্টের দেওয়ান হিসেবে পদে নিযুক্ত হয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। ১৭৭৯ খ্রিঃ এ গোকুলচন্দ্রের মৃত্যুর পর, সমস্ত সম্পত্তি  তাঁর ভাই কৃষ্ণচন্দ্র ঘোষালের একমাত্র পুত্র মহারাজা জয়নারায়ণের দখলে আসে। এনাদের জমিদারী ত্রিপুরা, ভুলুয়া, বাখরগঞ্জ, ঢাকা এবং চব্বিশ পরগনা জেলায় ছিল। মোট জমিদারী সম্পত্তির পরিমান ১,৫০, ০০০ টাকা। 

মহারাজা জয়নারায়ণ ঘোষালই প্রথম খিদিরপুরের কাছে ভূকৈলাস রাজবাড়ীটি নির্মাণ করেন। এনার জন্যই এই বংশের মান মর্যাদা ফিরে আসে। জয়নারায়ণ দিল্লীর সম্রাটের নিকট থেকে  “ মহারাজা বাহাদুর ” উপাধি পান। এছাড়া ৩৫০০ ঘোড়-সওয়ার   রাখার  সনদ প্রাপ্ত হন। মহারাজা জয়নারায়ণ ইংরেজী, ফার্সী, সংস্কৃত, আরবী ও বাংলা ভাষায় সুদক্ষ ছিলেন। তিনি বিভিন্ন ছাত্রদের বিনাব্যয়ে পড়াশোনা করাতেন। এমনকি বহুব্যয়ে বারানসীতে একটি কলেজও স্থাপন করেন, যা ” জয়নারায়ণ কলেজ ” নামে পরিচিত। এই কলেজটি বর্তমানে মিশনারীর কর্তৃপক্ষ থেকে পরিচালিত হয়। এছাড়াও তিনি বারানসীতে গুরুধাম নামক একটি ঠাকুরবাড়ি করুনাধীন মহাদেবের নামে নির্মান করেন। 

দুটি শিবলিঙ্গ আছে এই রাজবাড়িতে। যা এশিয়ার বড় শিবলিঙ্গগুলির মধ্যে অন্যতম। এর মধ্যে একটি বড় কালো কষ্টি পাথরে তৈরি প্রায় ১১ ফুট উচ্চতার শিবলিঙ্গ। শিব মন্দির দুটি ছাড়াও চৌহদ্দির মধ্যে একটি পতিতপাবনী দুর্গার মন্দির রয়েছে। তৈরি হয়েছিল ১৭৮২ সালে। এখনও বিশাল ধূমধাম করে  উৎসব পালিত হয় শিবরাত্রিতে।

         

প্রায় ২৫০ বছর আগে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে  যখন খিদিরপুরে ঘোষাল রাজবাড়ি স্থানান্তরিত হয়, তখনই রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল এই দুটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে। পঞ্চাশ একর জমির উপর শিবগঙ্গা নামে একটি বিশাল দিঘী খনন করেন।

যে বছর সম্রাটের কাছ থেকে রাজা বাহাদুর উপাধি লাভ করেন, সেই বছরই ১৭৮১ সালেই শিব-গঙ্গা পুকুরের পাড়ে নির্মিত হয় শিব মন্দির দুটি। মহারাজের বাবা ও মায়ের নাম অনুসারে নামকরণ করা হয় মন্দির দুটির। জয়নারায়ণ নির্মিত মন্দিরগুলি রক্তকমলেশ্বর ও কৃষ্ণচন্দ্রেরশ্বর নামে খ্যাত । তৎকালীন মহারাজ জয়নারায়ণ প্রাসাদে অষ্টধাতুর কুলদেবী মা পতিত পাবনী মন্দির নির্মাণ করেন। পরে ওই মন্দিরের পাশে আরও চারটি মন্দির স্থাপন করেন। সেগুলি মকরবাহিনী গঙ্গা, পঞ্চানন দেব, রাজেশ্বর মহালিঙ্গ ও জয়কালী ভৈরব প্রভৃতি।এই সুন্দর মন্দির গুলি হিন্দু মুসলমান ও গ্রীক স্থাপত্যের নিদর্শন স্বরূপ বিরাজ করছে।

শোনা যায় সাধক রামপ্রসাদ ওই শিব মন্দির দর্শন করতে এসেছিলেন। তিনি এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে একশো পঞ্চাশ বিঘার উপর নির্মিত শিবমন্দির ও প্রাসাদের নাম রেখেছিলেন ভূকৈলাস (অর্থ পৃথিবীতে শিবের বাসস্থান কৈলাস)। ভূকৈলাসের শিবলিঙ্গ দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ বলেই খ্যাত। দুটি মন্দিরের মধ্যে রয়েছে শিব গঙ্গা নামে বিশাল দিঘী ও মন্দিরের সামনে রয়েছে নন্দীর বিরাট মূর্তি । প্রতিবছর এখানে ধুমধাম করে শিবরাত্রি পালিত হয়,মেলা বসে । খিদিরপুর ট্রাম ডিপোর উল্টোদিকের গলির বেশ কিছুটা ভেতরে অবস্থিত এই রাজবাড়ি।

বাকুলিয়ার ঘোষাল বংশের রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল ছিলেন যেমন (১৭৫২-১৮২১) শিক্ষিত, তেমনই বিচক্ষণ এবং বহুভাষায় পারদর্শী। বাংলা, হিন্দি, পার্সি ও ইংরেজি ভাষা জানতেন। তিনি ‘provincial counsel’ নির্বাচিত হয়ে ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান ও পাটনা দেখাশোনার দায়িত্ব পান। দিল্লির বাদশাহ জাহাঙ্গীর তাঁকে রাজা উপাধি দেন এবং প্রচুর পরিমাণে অর্থ লাভ করেন। ভূকৈলাস রাজবাড়ীর সমস্ত সম্পত্তি এখন পতিতপাবনী মন্দিরের নামে দেবোত্তর করা হয়েছে ।

১৯৯৬ সালে কলকাতা পুরসভা এই মন্দিরগুলিকে ‘হেরিটেজ সাইট’ হিসাবে চিহ্নিত করেন। কয়েক বছর আগে রাজ্য সরকার মন্দিরগুলি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করে। মহারাজা জয়নারায়ণ এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র কালিশঙ্কর ঘোষাল কাবুল যুদ্ধের সময় ইংরেজদের সাহায্য করার জন্য, লর্ড আয়েলেনবার এর কাছ থেকে রাজাবাহাদুর উপাধি লাভ করেন। 

রাজা কালীশংকর ঘোষালের সাত পুত্র। জ্যৈষ্ঠপুত্র কাশীকান্ত ঘোষাল অল্প বয়েসেই পরলোক হন। মধ্যমপুত্র সত্যকিঙ্কর ঘোষাল প্রথম ইংরেজ সরকারের কাছ থেকে রায়বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। সেজপুত্র রাজ কুমার সত্যচরণ ঘোষাল একজন গণমান্য জ্যোতিষ। পরে ইনিও রাজাবাহাদুর উপাধি লাভ করেছিলেন। এনার দুই পুত্র কুমার সত্যানন্দ  কুমার সতাসত্য ঘোষাল। রাজাবাহাদুর সত্যশরণ ঘোষাল  সুপন্ডিত ছিলেন। ইংরেজ সরকার তাঁকে C.S.I উপাধি সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। এনার একটি কন্যা ছাড়া বাকি সবকটি পুত্র বাল্যকালে মারা যান। কন্যাটির সহিত প্রেসিডেন্সি কলেজের  অধ্যাপক মহেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিবাহ হয়। 

১৮৬৯ সালে সরকার রাজা সত্যচরণ ঘোষালের মৃত্যুর পর জৈষ্ঠপুত্র কুমার সত্যানন্দ ঘোষালকে রাজাবাহাদুর উপাধি প্রদান করেন। ইনি British Indian Association এর সভ্য এবং বঙ্গীয় ব্যবস্থাপকের সভার  সভ‍্য ছিলেন। কুমার সত্যকৃষ্ণ  ” সুবার্বন মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার ” এবং কলিকাতা পুলিশের অনারারী ম‍্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। 

 

তথ্যসূত্র :-  (১)  কলিকাতা সেকালের ও একালের; হরিসাধন মুখোপাধ্যায়

 (২)  কলিকাতা দর্পণ; রাধারমণ মিত্র 

(৩) https://bn.m.wikisource.org/wiki/

 

ছবি- লেখক

 

 


Share your experience
  • 287
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    287
    Shares

Facebook Comments

Post Author: সায়ন দাস

সায়ন দাস
সায়ন দাস।তরুণ ক্ষেত্রসমীক্ষক ও গবেষক।